ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের ইউসুফ মাতুব্বরের ডাঙ্গি এলাকায় পদ্মা নদীর ভাঙন এখন এক চরম ভয়াবহ ও মানবিক বিপর্যয়কর রূপ ধারণ করেছে। পদ্মার তীব্র স্রোত আর ঢেউয়ের গর্জনে প্রতিনিয়ত চোখের পলকেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে চরাঞ্চলের মানুষের বছরের পর বছর ধরে গড়া সোনালী স্বপ্ন। যেখানে কয়েকদিন আগেও ছিল মাইলের পর মাইল সবুজ ফসলের মাঠ, আজ সেখানে শুধুই থৈ থৈ পানি। আচমকা এই ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন স্থানীয় প্রান্তিক চাষিরা। জমি ও ফসল হারিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়ে নিয়তির ওপর ভাগ্য ছেড়ে দিয়েছেন তারা। ইতিমধ্যেই নদীপাড়ের অন্তত অর্ধশতাধিক পরিবার নিজেদের ঘরবাড়ি ভেঙে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছেন।
সরেজমিনে ইউসুফ মাতুব্বরের ডাঙ্গি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদী পাড়ের ফসলি জমি থেকে তড়িঘড়ি করে অপরিপক্ক কাঁচা পাট কেটে ঘরে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন চাষিরা। ফসলের চেয়ে জমি বাঁচানোই এখন তাদের প্রধান যুদ্ধ। স্থানীয় বাসিন্দা আজিজার মোল্যা ইটিসি বাংলাকে বলেন, “গত এক সপ্তাহ ধরে ভাঙন যে রূপ নিছে, তা বাপের জন্মে দেখিনি। সব শেষ সম্বল পদ্মায় চইলা গ্যাছে।”
নদীর পাড়ে একদৃষ্টিতে পানির দিকে চেয়ে বসে থাকা ভুক্তভোগী আকলিমা বেগম তাঁর জীবনের করুণ খতিয়ান তুলে ধরে ইটিসি বাংলাকে বলেন:
“বাবা, এ পর্যন্ত চার চার বার আমার বসতবাড়ি পদ্মায় ভাইঙা গ্যাছে। একটা মানুষ জীবনে কয়বার ঘর তুলতে পারে? এখন যেখানে কোনো রকমে আছি, তার থেইকা মাত্র ২০০ মিটার দূরে নদী গর্জন করতেছে। স্বামী মারা গেছে, ছোট দুইটা সন্তান নিয়া কীভাবে বাঁচবো জানি না। রাতে একটুও দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারি না, মনে হয় এই বুঝি ঘরটা তলায়া গেল! তাই রাতে না ঘুমায়ে দিনের বেলা নদীপাড়ে আইসা বইসা থাকি, যদি নদী দয়া করে।”
একই গ্রামের আরেক ভুক্তভোগী কবির মোল্যার গল্পটি আরও যন্ত্রণাদায়ক। একসময় যাঁর চরের জমিতে ডজনখানেক কিষাণ বা দিনমজুর কাজ করত, পদ্মার পেটে জমি চলে যাওয়ার পর আজ তিনি নিজেই অন্যের জমিতে দিনমজুর বা কামলা খাটছেন। কোনো রকমে একটা খুপরি বা ছাপড়া উঠিয়ে অন্যের জায়গায় সপরিবারে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।
বর্তমানে এই তীব্র ভাঙনের কারণে নর্থচ্যানেল চরাঞ্চলের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চরটেপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি কমিউনিটি ক্লিনিক, মাদ্রাসা ও মসজিদসহ একাধিক সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান চরম বিলীনের ঝুঁকিতে রয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে এগুলো নদীগর্ভে তলিয়ে গেলে চরের হাজারো শিশুর শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে।
চরটেপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুশান্ত কুমার ঘোষ ইটিসি বাংলাকে তাঁর চরম উদ্বেগের কথা জানিয়ে বলেন:
“স্কুল ভবন থেকে নদী এখন মাত্র ২০০ মিটার দূরত্বে অবস্থান করছে। দুই বছর আগে ভাঙনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড কিছু জিও ব্যাগ ফেলেছিল, এবার ভাঙনের তীব্রতায় সেই জিও ব্যাগের অংশও ধসে নদীতে চলে গেছে। জরুরি ভিত্তিতে এখন নতুন করে জিও ব্যাগ না ফেললে স্কুলটি রক্ষা করা অসম্ভব হবে। তবে জিও ব্যাগ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, আমরা সরকারের কাছে এখানে একটি স্থায়ী সিসি ব্লক বা টেকসই বাঁধ নির্মাণের জোর দাবি জানাচ্ছি।”
স্থায়ী বাঁধের দাবিতে চরের আরেক বাসিন্দা ছালাম শেখ বলেন, সরকার প্রতি বছর লাখ লাখ টাকার বস্তা ফেলে নদীতে, যা কাজের কাজ কিছুই হয় না। স্থায়ী বাঁধ দিলে চরের মানুষগুলো কোনো রকমে বেঁচে থাকতে পারত।
নর্থচ্যানেল চরাঞ্চলের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ফরিদপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইটিসি বাংলাকে জানান, প্রতি বছরই বর্ষা ও বৃষ্টির সময় ওই এলাকায় ভাঙন দেখা দেয়, তবে এবার ভাঙনের তীব্রতা অনেক বেশি। তিনি বলেন, “আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। স্কুল ও ক্লিনিক রক্ষার্থে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে জরুরি ভিত্তিতে ওই স্থানে নতুন করে জিও ব্যাগ ফেলার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, ওই এলাকায় স্থায়ী নদীশাসন ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য ইতিমধ্যেই একটি মেগা প্রকল্প প্রণয়নের কাজ ফাইল আকারে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।”
