‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ থেকে সমঝোতা! ইরান ইস্যুতে কেন ইউটার্ন নিলেন ট্রাম্প?

শুরুতে যে চরম হুংকার ও সামরিক দাপট নিয়ে ইরান অভিমুখে রণতরী পাঠিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুদ্ধ শেষের দোরগোড়ায় এসে সেই সুর নরম করতে বাধ্য হয়েছেন হোয়াইট হাউসের কর্ণধার ডোনাল্ড ট্রাম্প। সংঘাতের শুরুর দিকে ট্রাম্পের অলঙ্ঘনীয় শর্ত ছিল—ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ওয়াশিংটন কোনো আলোচনা বা চুক্তি করবে না। তবে কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী ও ব্যয়বহুল সংঘাতের পর বৈশ্বিক অর্থনীতি, সামরিক চোরাবালি এবং কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত তেহরানের সাথে আপস ও চুক্তির পথেই হাঁটতে বাধ্য হলো মার্কিন প্রশাসন।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আকস্মিক ও অভাবনীয় পিছুটানের নেপথ্যে মূলত ৪টি প্রধান কৌশলগত ও অর্থনৈতিক আশঙ্কা কাজ করেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক ধাক্কাটি এসেছে অর্থনৈতিক সংকটের দিক থেকে। সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি (Strait of Hormuz) ঘিরে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহে বড় ধরণের অস্থিরতা ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের এই লাইফলাইন বন্ধ বা বিঘ্নিত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়ার চরম আশঙ্কা দেখা দেয়। তেলের দামের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সরাসরি মার্কিন অভ্যন্তরীণ বাজার এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরণের মন্দা ডেকে আনতে পারত—যা ব্যবসায়ীসুলভ মানসিকতার ট্রাম্পের জন্য ছিল একটি বড় রেড সিগন্যাল।

দ্বিতীয় বড় চাপটি এসেছে মার্কিন পেন্টাগনের সামরিক খরচের খতিয়ান থেকে। ইরানের সাথে সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হচ্ছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অপারেশনাল ব্যয় ততই আকাশচুম্বী রূপ নিচ্ছিল। হিসাব অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সরাসরি সামরিক ও অপারেশনাল খাতে ওয়াশিংটনের এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি (২৯ বিলিয়ন) ডলার অর্থ অপচয় হয়েছে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ যদি আরও কয়েক মাস চলত, তবে তা এক সময়ে মার্কিনীদের জন্য আফগানিস্তান কিংবা ইরাক যুদ্ধের মতো এক অন্তহীন ও চরম ব্যয়বহুল চোরাবালিতে পরিণত হতো। আর এই দীর্ঘ যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে চরম আত্মঘাতী ও ঝুঁকিপূর্ণ হতো।

ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করা যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ভুল ছিল, তা তেহরানের পাল্টা রণকৌশলেই স্পষ্ট। যুদ্ধ চলাকালীন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে নিখুঁত আঘাত হানতে শুরু করে ইরান ও তাদের আঞ্চলিক প্রক্সি গ্রুপগুলো। ট্রাম্প প্রশাসন বুঝতে পারে যে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেহরান কেবল হরমুজ প্রণালি নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে মার্কিন স্বার্থ এবং তাদের মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক অবর্ণনীয় ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে।

এই সংঘাতের শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক ও ইউরোপীয় মিত্ররা ওয়াশিংটনের এই যুদ্ধংদেহী নীতির পক্ষে ছিল না। ইউরোপের দেশগুলো প্রথম থেকেই চাইছিল দ্রুত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমানো হোক, যাতে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও ইউরোপের জ্বালানি আমদানিতে কোনো বড় ধাক্কা না লাগে। মার্কিন বিশেষ দূত উইটকফের সুইজারল্যান্ড সফর এবং ওয়াশিংটনের সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ইরানি স্পিকার গালিবাফের হুঁশিয়ারি—সব মিলিয়ে তীব্র আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ ট্রাম্পকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *