ফিফার নিয়মাবলী ও ফুটবল ইতিহাসে যোগ হলো সম্পূর্ণ নতুন এক অধ্যায়। প্রতিপক্ষের ফুটবলারের সামনে দাঁড়িয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ ঢেকে কোনো কথা বা মন্তব্য করলেই এখন থেকে দেখতে হবে সরাসরি ‘লাল কার্ড’ (Red Card)—এমনই এক বৈপ্লবিক ও কঠোর আইন জারি করেছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা (FIFA)। আর ২০২৬ বিশ্বকাপের হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে এই নতুন আইনের গ্যাঁড়াকলে পড়ে ফুটবল ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে মাঠ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে এক লজ্জাজনক রেকর্ডের পাতায় নাম লেখালেন প্যারাগুয়ের তারকা মিডফিল্ডার মিগুয়েল আলমিরন (Miguel Almirón)।
আজ শনিবার (২০ জুন, ২০২৬) যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘ডি’ (Group D)-এর দ্বিতীয় হাই-প্রোফাইল ম্যাচে প্যারাগুয়ে বনাম তুরস্কের মধ্যকার লড়াইয়ে এই অবিশ্বাস্য ও নজিরবিহীন ঘটনাটি ঘটে।
ম্যাচের প্রথমার্ধের ঠিক শেষ মুহূর্তের দিকে মাঠের ভেতর দুই দলের ফুটবলারদের মধ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠে। ঠিক ওই সময় প্যারাগুয়ের ১০ নম্বর জার্সিধারী তারকা আলমিরন নিজের হাত দিয়ে মুখ ঢেকে তুর্কি ডিফেন্ডার মের্ত মুলদুরের (Mert Müldür) একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কিছু একটা বলেন। মুলদুর তাৎক্ষণিকভাবে রেফারির কাছে গিয়ে আলমিরনের এই মুখ ঢাকার বিষয়টি নিয়ে তীব্র আপত্তি ও অভিযোগ জানান।
মাঠের মূল রেফারি প্রথমে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইলেও পরবর্তীতে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR)-এর রুম থেকে তাঁকে ঘটনাটি পুনরায় রিভিউ করার অনুরোধ জানানো হয়। ভিএআর মনিটরে রিপ্লে দেখে ঘটনাটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করার পর এল সালভাদরের বিখ্যাত রেফারি ইভান বার্টন প্যারাগুয়ের আলমিরনকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান।
রেফারি ইভান বার্টন স্টেডিয়ামের মাইক অন করে মাঠে উপস্থিত হাজার হাজার দর্শক ও বিশ্ববাসীকে লাউডস্পিকারে অফিশিয়াল ঘোষণা দিয়ে বলেন:
“ভিএআর (VAR) পর্যালোচনার পর স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, প্যারাগুয়ের ১০ নম্বর খেলোয়াড় (মিগুয়েল আলমিরন) প্রতিপক্ষ ফুটবলারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের মুখ ঢেকে কথা বলেছেন, যা ফিফার নতুন আইনের পরিপন্থী। অতএব চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত—সরাসরি লাল কার্ড।”
ফিফার এই অদ্ভুত ও কঠোর নিয়মটি চালুর পেছনে রয়েছে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের (UCL) একটি চরম বিতর্কিত ও ঐতিহাসিক বর্ণবাদী ঘটনা। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের একটি ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার ভিনিসিউস জুনিয়রকে নিজের মুখ হাত দিয়ে ঢেকে কিছু একটা বলেছিলেন বেনফিকার আর্জেন্টাইন তারকা জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ান্নি। ওই সময় ভিনিসিউস দাবি করেছিলেন যে, প্রেস্তিয়ান্নি তাঁকে মুখ ঢেকে অত্যন্ত নোংরা বর্নবাদী (Racist) গালি দিয়েছেন। কিন্তু প্রেস্তিয়ান্নি মুখ হাত দিয়ে ঢেকে রাখায় পরবর্তীতে লিপ-রিডিং (ঠোঁট মিলিয়ে কথা বোঝা) বা ক্যামেরার মাধ্যমে রেফারিদের পক্ষে সেই গালির সত্যতা যাচাই করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
এই ঘটনার পর ভ্যাঙ্কুভারে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ফিফা কংগ্রেসে ফুটবল মাঠ থেকে বৈষম্যমূলক আচরণ চিরতরে নির্মূল করতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ফিফার নিয়ম প্রণয়নকারী সর্বোচ্চ সংস্থা ‘আইএফএবি’ (IFAB) এক বিবৃতিতে সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন দেয় যে—২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে কোনো খেলোয়াড় যদি মাঠের ভেতর বৈষম্যমূলক বা অনুপযুক্ত আচরণ গোপন করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিপক্ষের সামনে মুখ ঢেকে কথা বলেন, তবে ঠোঁট না পড়েও স্রেফ মুখ ঢাকার অপরাধেই তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেওয়া হবে। আজ প্যারাগুয়ে-তুরস্ক ম্যাচেই ফুটবল বিশ্ব এই আইনের প্রথম বাস্তব প্রয়োগ দেখল।
চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে এই নতুন নিয়মের মারপ্যাঁচে মিগুয়েল আলমিরন এর আগেও একবার বড় আলোচনায় এসেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে প্যারাগুয়ের প্রথম ম্যাচে মার্কিন ডিফেন্ডার টিম রিমকে প্রথমে ফাউলের অপরাধে রেফারি ভুলবশত হলুদ কার্ড দেখিয়েছিলেন। কিন্তু ভিএআর রেফারিকে তাৎক্ষণিক ইন্টারফেয়ার করে জানায় যে রেফারি ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দিচ্ছেন। পরবর্তীতে রিপ্লে দেখে রেফারি নিজের সিদ্ধান্ত বদলান এবং রিমের হলুদ কার্ড বাতিল করে, আলমিরনকে পেনাল্টি বক্সে ডাইভিং বা অভিনয়ের (Simulation) দায়ে উল্টো হলুদ কার্ড ধরিয়ে দেন।
উল্লেখ্য, এবারের বিশ্বকাপে ফিফা ভিএআর (VAR)-এর ক্ষমতা ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি করেছে। এখন শুধু গোল, পেনাল্টি বা সরাসরি লাল কার্ডই নয়—ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়া, কিংবা রেফারি যদি মাঠের ভেতর স্পষ্টভাবে কোনো ভুল কর্নার কিক বা থ্রো-ইনের সিদ্ধান্ত নেন, তবে দ্রুত সিদ্ধান্ত সংশোধনের স্বার্থে ভিএআর রেফারিকে সরাসরি দিকনির্দেশনা ও সহায়তা দিতে পারবে।
