ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ২০ হাজারে মীমাংসার চেষ্টা, ওলামা দল নেতার সালিস

দেশের প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এবং মানবাধিকারের চরম অবমাননা করে বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলায় এক মাদ্রাসা ছাত্রীকে (০৮) দোকানদার কর্তৃক ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা আপস-মীমাংসার নামে প্রকাশ্যে প্রহসনের সালিস বসানোর ঘটনা ঘটেছে। সালিস চলাকালীন দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে বৈঠক পণ্ড হওয়ার পর, সেই ভয়াবহ ও স্পর্শকাতর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র তোলপাড় ও নিন্দার ঝড় উঠেছে।

গত মঙ্গলবার (১৬ জুন, ২০২৬) সন্ধ্যার দিকে বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার একটি ইউনিয়নের নিভৃত গ্রামে এই মধ্যযুগীয় ঘটনাটি ঘটে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই প্রহসনমূলক সালিসটির মূল হর্তাকর্তা ও পরিচালক ছিলেন জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বিতর্কিত সদস্য তথা জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের কচুয়া উপজেলা ও জেলা যৌথ কমিটির অন্যতম যুগ্ম আহ্বায়ক মানফুজুর রহমান।

ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবার ও স্থানীয় মাদ্রাসা সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার (১৩ জুন, ২০২৬) স্থানীয় একটি মাদ্রাসার টিফিনের বিরতির সময় পাশের একটি মুদি দোকানে খাবার কিনতে গিয়েছিল আট বছর বয়সী ওই কোমলমতি শিশুটি। সে সময় দোকানদার লম্পট হাকিম সরদার তাকে কৌশলে চকলেট খুলে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে জনশূন্য নির্জন দোকানের ভেতরে ডেকে নিয়ে যান। শিশুটি ওই বয়োবৃদ্ধ দোকানিকে সামাজিকভাবে ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করত।

দোকানের ভেতর কোনো কাস্টমার না থাকার সুযোগে পৈশাচিক কামনার বশবর্তী হয়ে হাকিম সরদার ওই একাকী শিশুটিকে জাপটে ধরে কাপড়ের মুখ চেপে ধর্ষণের চেষ্টা চালান। তবে ঠিক ওই মুহূর্তে আরও দুটি ছোট শিশু দোকানে চলে আসায় এবং ভুক্তভোগী শিশুটি কোনোমতে রক্ষা পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে দ্রুত বাড়িতে ফিরে আসে। পরে শিশুটি তার মাকে এই পাশবিক ঘটনা খুলে বললে, মা তৎক্ষণাৎ মাদ্রাসার বড় হুজুর ইমরান হোসাইনকে বিষয়টি জানান। বড় হুজুর সন্ধ্যায় তাদের বাড়িতে এসে ঘটনার বিস্তারিত শুনে আইনের আশ্রয় না নিয়ে ‘ন্যায্য বিচার’ করে দেওয়ার ধোঁয়াশাপূর্ণ আশ্বাস দেন।

এদিকে এই বর্বর ঘটনাটি মুহূর্তের মধ্যে স্বজন ও প্রতিবেশীর মাধ্যমে জানতে পারেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক সদস্য ও স্থানীয় প্রভাবশালী বিএনপি নেতা মো. আরিফ হুসাইন। আগামী ইউপি নির্বাচনে ক্যান্ডিডেট হিসেবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন এই মেম্বার। রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে ও অভিযুক্ত ভোট ব্যাংক ধরে রাখতে তিনি থানা পুলিশকে সম্পূর্ণ আড়াল করে উপজেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের নাম ভাঙিয়ে সালিসের মাধ্যমে ‘আপস মীমাংসা’র নোংরা মিশনে নামেন। আরিফ মেম্বার অভিযুক্ত হাকিম সরদারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের জরিমানা বা ‘রফা’ করে ভুক্তভোগী দরিদ্র পরিবারটিকে মাত্র ২০ হাজার টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে মুখ বন্ধ করার চূড়ান্ত প্রস্তাব দেন।

এই ন্যাক্কারজনক আপস প্রক্রিয়ার বিষয়ে ইটিসি বাংলার মুখোমুখি হয়ে সাবেক ইউপি সদস্য আরিফ হুসাইন অত্যন্ত নির্লজ্জ ও আইনি ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা জানিয়ে এক অদ্ভুত সাফাই গেয়ে বলেন:

“দেখেন, এই গরিব পরিবারটি যদি কোর্টে গিয়ে এখন মামলা করে, তবে ওদের অন্তত ১০ বছর জাজমেন্টের পেছনে ঘুরতে হবে। পরে ওই লোকের হয়তো ৫ বছর জেল হবে। কিন্তু তাতে এই গরিব মানুষের কী লাভ হবে? উল্টো আরও বেশি লোকজন জানাজানি হলে মেয়েটি বড় হচ্ছে—ওর ভবিষ্যতে বিয়েশাদি দিতে ঝামেলা হবে। তাই সামাজিক ঝামেলা না করে এভাবে ২০ হাজার টাকা দিয়ে ফয়সালা করে ফেলাই সবচেয়ে উত্তম ছিল। পরিবারটি কিছু আর্থিক সাহায্য পেল, ভবিষ্যতে সুবিধা-অসুবিধা আমরা মেম্বাররা দেখব।”

এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে যে, কচুয়া উপজেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি ও প্রভাবশালী শিল্পপতি সরদার জাহিদের প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণেই এই সম্পূর্ণ বেআইনি সালিসটি বসানো হয়েছিল। তবে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে আরিফ মেম্বার দাবি করেন, “এখানে সব জাহিদ ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণে চলে ঠিকই, তিনি এই এলাকার বড় শিল্পপতি এবং ওনার দান পাননি এমন কোনো ঘর নেই। কিন্তু এই ঘটনার সাথে ওনাকে শুধু শুধু রাজনৈতিক শত্রুতা থেকে জড়ানো হচ্ছে।” টাকা নিয়ে মীমাংসার বিষয়ে পাল্টা প্রশ্ন করতেই আরিফ মেম্বার উত্তেজিত হয়ে ইটিসি বাংলার প্রতিবেদককে হুমকি দিয়ে বলেন, আপনাদের মতো সাংবাদিকদের কিছু রাজনৈতিক শত্রু লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে এখানে পাঠাইছে আমাদের নেতার বিরুদ্ধে লেখার জন্য। সাংবাদিক আমাদের পকেটেও আছে!”

যোগাযোগ করা হলে কচুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরদার জাহিদ ইটিসি বাংলাকে বলেন, “সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ায় একটি চক্র আমার নাম ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। এই মাদ্রাসা ও মসজিদটি আমরা পরিচালনা করি। একটি এতিমখানা আছে, সেখানে তদারকি করা কি আমাদের অপরাধ? প্রতিপক্ষরা বিষয়টিকে মব করার চেষ্টা করছে।”

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সালিস দেখতে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের শত শত উৎসুক মানুষের ঢল নামে। ভিডিওতে দেখা যায়, জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য ওলামা দল নেতা মানফুজুর রহমান শত শত মানুষের সামনে ওই আট বছরের ট্রমাটাইজড শিশুটিকে দাঁড় করিয়ে ধর্ষণের চেষ্টার পৈশাটিক ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিতে বাধ্য করছেন! উপস্থিত যুবকেরা তা হাসিমুখে মোবাইল ক্যামেরায় ভিডিও করছিল।

শিশুর জবানবন্দি শেষে অভিযুক্ত হাকিম সরদারকে জেরা করা হলে সে অপরাধ স্বীকার করে মানফুজুর রহমানের পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চায়। ঠিক ওই সময় হাকিমের ছেলে হাসিব সরদার দলবল নিয়ে সালিসে লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায় এবং উপস্থিত মব হাকিম সরদারকে জুতার মালা পরাতে চাইলে দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বেধে যায়। লাঠির আঘাতে সালিস পণ্ড হয়ে যায় এবং মারামারির শেষ দিকে পুলিশ এসে বাঁশি দিলে সবাই পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে এই ভিডিও ফেসবুকে যারা পোস্ট করেছেন, তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীরা মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া এবং ম্যাসেঞ্জারে হাত-পা কাটার হুমকি দিচ্ছে বলে ৩ জন ভুক্তভোগী ইটিসি বাংলাকে জানিয়েছেন।

ভয়ংকর এই সামাজিক ট্রমার শিকার হয়ে গত শনিবারের পর থেকে ওই ৮ বছরের শিশুটির মাদ্রাসায় যাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। সে মানসিকভাবে মারাত্মক বিপর্যস্ত হয়ে এক কোণে চুপচাপ বসে থাকছে। পরিবারের এক সদস্য কেঁদে ফেলে বলেন, আমরা গরিব মানুষ। কী করব, কোথায় যাব? মামলা করতে চাচ্ছি; কিন্তু আরিফ মেম্বারসহ রাজনৈতিক নেতারা ২০ হাজার টাকা নিয়ে প্রতিনিয়ত আমাদের চাপ দিচ্ছে মিটিয়ে ফেলার জন্য।”

সবচেয়ে রহস্যজনক ভূমিকা পালন করেছে স্থানীয় কচুয়া থানা পুলিশ। সালিস শুরুর আগে এবং সালিস চলাকালীন বাগেরহাটের অন্তত ৩ জন সিনিয়র সাংবাদিক কচুয়া থানা পুলিশকে সশরীরে ফোন করে ব্যবস্থা নিতে বললেও পুলিশ কোনো অ্যাকশনে যায়নি। কচুয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হারুন অর রাশিদ ইটিসি বাংলার প্রশ্নের জবাবে এক চরম দায়সারা লুকোচুরি খেলে বলেন:

“এই ঘটনায় পরিবার এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ দেয়নি। আমরা তাদের ডেকেছি, কিন্তু তাদের আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে দোটানা ভাব আছে, তাই মামলা করতে আসছে না। জোর করে তো আনা যায় না।”

বিনা অভিযোগে ধর্ষণচেষ্টার মতো আমলযোগ্য অপরাধে সালিস কীভাবে হলো এবং পুলিশ কেন জানল না—জানতে চাইলে এই পুলিশ কর্মকর্তা আমতা আমতা করে বলেন, “সালিস কোথায় হয়েছে তা তো আমরা জানি না। ওই দিন মারামারি থামাতে পুলিশ গিয়েছিল ঠিকই, তবে ঘটনার মূল বিবরণ থানার ওসি স্যার হয়তো ভালো জানতেন। কিন্তু ওসি স্যার তো আজই হঠাৎ করে বদলি (Transfer) হয়ে চলে গেছেন।” ওলামা দলের নেতা মানফুজুর রহমান এই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরপরই গ্রাম ছেড়ে সটকে পড়ে বর্তমানে ঢাকায় আত্মগোপন করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *