জাতীয় সংসদের কোনো সদস্যই আইনগতভাবে ‘ঋণখেলাপি’ নন, তাঁরা সর্বোচ্চ ব্যাংক বা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ‘ঋণগ্রস্ত’ (Indebted) হতে পারেন বলে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আইনি প্রক্রিয়ায় বৈধ প্রার্থী ঘোষিত হয়েই সবাই নির্বাচনে জিতে সংসদে এসেছেন, ফলে এই সংসদকে ‘ঋণখেলাপিদের সংসদ’ বলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, বেআইনি এবং চরম মানহানিকর।
আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন, ২০২৬) সংসদ অধিবেশনে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’-এ দেওয়া এক তীব্র সমালোচনামূলক বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারের পক্ষে এই কঠোর ও আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।
বিরোধী দলের আনীত অভিযোগের আইনি ব্যবচ্ছেদ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “আমাদের দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, বিশেষ করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অর্ডার (RPO) সহ অন্যান্য নির্বাচনী বিধিমালায় স্পষ্ট বিধান রয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি দেশের আদালত বা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক চূড়ান্তভাবে ‘ঋণখেলাপি’ হিসেবে সাব্যস্ত বা ঘোষিত হন, তবে তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেন। তিনি এমপি পদে মনোনয়ন জমা দিতেই পারেন না।”
তিনি আরও যোগ করেন, “যাঁরা আজ নির্বাচিত হয়ে আইনপ্রণেতা হিসেবে সংসদে বসে আছেন, এর সোজা অর্থ হলো তাঁরা ঋণগ্রস্ত হতে পারেন, কিন্তু কেউ ঋণখেলাপি নন। এখন রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে কেউ যদি রাজপথে বা সংসদের ফ্লোরে দাবি করেন যে এই সংসদে ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তা কোনোভাবেই আইনগত ব্যাখ্যার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদকে অবহিত করেন যে, বর্তমান এমপিদের মধ্যে যাঁদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল, তাদের কারো কারো বিরুদ্ধে ব্যাংক বা অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পূর্বতন মামলা থাকলেও, সেগুলো নির্বাচনের আগেই মহামান্য হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে আইনিভাবে নিষ্পত্তি (Stay/Settled) হয়ে গেছে। উচ্চ আদালত থেকে প্রার্থীতা বৈধ ঘোষিত হওয়ার পর তিনি আর আইনত ঋণখেলাপি থাকেন না। সুতরাং, এই সংসদকে খাটো করে দেওয়া বক্তব্যগুলো অনতিবিলম্বে সংসদের কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ (Expunge) বা মুছে ফেলা উচিত।
এর আগে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বর্তমান সংসদের চরিত্র নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ফোরক দাবি উত্থাপন করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি স্পিকারের উদ্দেশ্যে বলেন:
“আমি সংসদ নির্বাচনের আগেও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে রাজপথে কথা বলেছি, কিভাবে তাঁদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তা দেশের মানুষ দেখেছে। নির্বাচনের পরেও আমি আমার প্রথম অধিবেশনের বক্তব্যে এই পবিত্র সংসদে দাঁড়িয়ে অনেক সংসদ সদস্যের কত হাজার কোটি টাকা ঋণখেলাপি রয়েছে, সেই সুনির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করেছিলাম। শুধুমাত্র তাঁদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্মানার্থে আমি নামগুলো মুখ ফুটে প্রকাশ করিনি।”
তরুণ এই বিরোধী দলীয় নেতা আরও তোপ দেগে বলেন, “এখন যদি সংসদে এত বিপুল সংখ্যক বড় বড় ঋণখেলাপি ব্যক্তি আইনপ্রণেতা হিসেবে বসে থাকেন, তাহলে দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ তো এই সংসদকে স্বাভাবিকভাবেই ‘ঋণখেলাপিদের সংসদ’ বলবে। বিশেষ করে সরকারি দলীয় লোকেরা যাঁরা টু-থার্ড (দুই-তৃতীয়াংশ) মেজরিটি বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছেন, তাঁরাই এই খেলাপিদের সংসদে টেনে নিয়ে এসেছেন।”
