পর্তুগালের ‘সম্পদ’ নাকি ‘বোঝা’? বিশ্বকাপ উদ্বোধনে রোনালদোকে ঘিরে অস্বস্তিকর প্রশ্ন

এক সময় প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে আতঙ্কের অপর নাম ছিলেন ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। তাঁর অতিমানবীয় গতি, পেশিশক্তি, গোল করার আদিম ক্ষুধা আর অবিশ্বাস্য ফিনিশিং ক্ষমতা বদলে দিয়েছিল আধুনিক ফুটবলের চেনা সংজ্ঞা। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ শেষ হতেই সেই রোনালদোকে ঘিরেই ফুটবল বিশ্বে উঠছে এক চরম অস্বস্তিকর ও ঐতিহাসিক প্রশ্ন—পর্তুগাল দলের জন্য তিনি কি এখনো সম্পদ, নাকি এক ভারী বোঝা?

বিশ্বকাপে নিজেদের উদ্বোধনী ম্যাচে পুঁচকে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করে মাঠ ছেড়েছে সাবেক ইউরো চ্যাম্পিয়ন পর্তুগাল। ম্যাচে বলের দখল, নিখুঁত পাসিং কিংবা আক্রমণ সাজানোর ক্ষেত্রে ইউরোপিয়ান পরাশক্তিদের আধিপত্য স্পষ্ট থাকলেও, গোলের সামনে গিয়ে তারা ছিল চরম অসহায়। আর সেই ব্যর্থতার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্বয়ং ৪১ বছর বয়সী অধিনায়ক সিআরসেভেন।

ডিআর কঙ্গোর ডিফেন্সের সামনে ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকার উপস্থিতি ছিল অনেকটাই ম্লান। একনজরে তাঁর ম্যাচের পারফরম্যান্সের এক্স-রে:

  • মোট বল স্পর্শ: মাত্র ২৫ বার (পুরো ৯০ মিনিটে)।
  • অন-টার্গেট শট: ০ (লক্ষ্যভেদী একটি শটও নিতে পারেননি)।
  • আক্রমণে ভূমিকা: প্রায় অদৃশ্য ও ছায়াবৃত।

যে খেলোয়াড় একসময় সুযোগ তৈরি না হলেও একক নৈপুণ্যে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতেন, কঙ্গোর বিপক্ষে তাঁকে ডি-বক্সের ভেতর সতীর্থদের পাসের আশায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।

ম্যাচ শেষে বিখ্যাত ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি তাঁর ফুটবল বিশ্লেষণে একটি অমোঘ কথা বলেছেন, যা পর্তুগাল দলের বর্তমান নগ্ন বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে। অঁরি বলেন, দলের গোল দরকার, তোমার ব্যক্তিগত গোল নয়।”

পরিসংখ্যানও রোনালদোর সোনালী অতীতের পক্ষে কথা বলছে না। ইউরো ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বড় টুর্নামেন্টে টানা ১০ ম্যাচ ধরে গোলশূন্য পর্তুগিজ এই ফরোয়ার্ড। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক চারটি বড় বৈশ্বিক ম্যাচে তিনি প্রায় পুরো সময় মাঠে থাকলেও পর্তুগাল দলগতভাবে গোল পেয়েছে মাত্র ১টি।

বয়সের অমোঘ নিয়মে রোনালদোর চিরচেনা খেলায় বড় পরিবর্তন এসেছে। আগের মতো উইং ধরে গতিশীল ড্রিবলিং, কিংবা ডিফেন্ডারদের ছিটকে দিয়ে রক্ষণভাগ ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার সেই চাবুক গতি আর নেই। সময়ের সাথে মানিয়ে নিতে তিনি নিজেকে ‘বক্স-কেন্দ্রিক’ (Poacher) পিওর স্ট্রাইকারে রূপান্তর করেছেন। কিন্তু মাঝমাঠ থেকে ব্রুনো ফার্নান্দেস, ভিতিনিয়া ও বার্নার্দো সিলভার মতো সৃজনশীল জাদুকররা একের পর এক সুযোগ তৈরি করলেও, সেই বলকে জালে জড়ানোর আদিম ধারটি হারিয়ে ফেলেছেন সিআরসেভেন।

তবে এতসব কঠোর সমালোচনার মাঝেও রোনালদোর মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্ব উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি এখনো ড্রেসিংরুমের একমাত্র নেতা, দলের মূল অনুপ্রেরণার উৎস এবং ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক গোলদাতা (International Top Scorer)। তাঁর বিশাল অভিজ্ঞতা ও উপস্থিতি দলের তরুণ তুর্কিদের জন্য এক বড় আত্মিক শক্তি।

পর্তুগালের স্প্যানিশ কোচ রবার্তো মার্তিনেসও তাই অধিনায়কের ওপর থেকে আস্থা হারাননি। ম্যাচ শেষে রোনালদোকে তুলে না নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, “যখন আপনার দলের দ্রুত গোল প্রয়োজন, ঠিক তখনই ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাকে মাঠ থেকে তুলে বেঞ্চে বসিয়ে রাখার কোনো ফুটবলীয় মানে হয় না।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *