দেশের রাজনৈতিক ও সংসদীয় রেওয়াজ অনুযায়ী সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা বিশিষ্টজনদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে জাতীয় সংসদ। প্রয়াত এই সমস্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংসদ কক্ষে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন উপস্থিত সংসদ সদস্যরা। নীরবতা পালন শেষে প্রয়াত আত্মাদের মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন সংসদ সদস্য এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান।
রোববার (৭ জুন, ২০২৬) শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের প্রথম কার্যদিবসে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এই আনুষ্ঠানিক শোক প্রস্তাবটি সংসদে উত্থাপন করেন। স্পিকার কর্তৃক উত্থাপিত শোক প্রস্তাবটি পরবর্তীতে উপস্থিত সকল সংসদ সদস্যের সর্বসম্মতিক্রমে সংসদে গৃহীত হয়।
সংসদের রীতি অনুযায়ী অধিবেশনের প্রথম দিনে বিগত সময়ে প্রয়াত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নাম শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এবারের শোক প্রস্তাবে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নাম হিসেবে ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এবং মোশাররফ হোসেন। সংসদীয় রাজনীতিতে এবং দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক আন্দোলনে তাঁদের অবদানকে স্মরণ করে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়।
এর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের আরেক প্রভাবশালী প্রবীণ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম রহমত উল্লাহ, দবিরুল ইসলাম, এ বি এম আনোয়ারুল হক এবং মোসলেম উদ্দিনের মৃত্যুতেও সংসদ গভীর শোক প্রকাশ করে। এছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ এবং দশম জাতীয় সংসদের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য আবদুল মতিনের মৃত্যুতেও গভীর দুঃখ ও শোক প্রকাশ করে এই সংসদীয় প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।
দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে ভূমিকা রাখা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাবেক জনপ্রতিনিধি ও নেতাদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানানো হয় এই শোক প্রস্তাবে। বিএনপি সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী মিজানুর রহমান সিনহা, অধ্যাপক এম এ মান্নান এবং সাবেক সংসদ সদস্য দেওয়ান শামসুল আবেদীন ও জি এম ফজলুল হকের মৃত্যুতে শোক জ্ঞাপন করে সংসদ।
একই সাথে জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ মো. কায়সার, আবু নূর মোহাম্মদ বাহাউল হক ও গোলাম সারোয়ার মিলন এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সংসদ সদস্য মো. সামসুদ্দোহার মৃত্যুতেও শোক প্রকাশ করা হয়। এছাড়া বর্তমান সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সহধর্মিণী অধ্যাপক দিলারা হাফিজের মৃত্যুতে জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করা হয়।
রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি দেশের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতা ক্ষেত্রে অপূরণীয় অবদান রেখে যাওয়া বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের নামও শোক প্রস্তাবে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে স্থান পায়। জাতীয় সংসদে জাতীয় অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদ, বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি হেলাল হাফিজ, সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের সভাপতি সনজীদা খাতুন, বরেণ্য সংগীতশিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী এবং প্রখ্যাত লেখক ও গবেষক বদরুদ্দীন উমরের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়।
এই তালিকায় আরও ছিলেন বিশিষ্ট নজরুল সংগীতশিল্পী ডালিয়া নওশীন, বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা আব্দুল কুদ্দুস, প্রখ্যাত নাট্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান, দেশের বর্তমান সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেনের মাতা বেগম জেবুন্নেছা, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিউল বারী বাবু, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় গুরু সংঘরাজ ড. জ্ঞানশ্রী মহাস্থবির এবং বিশিষ্ট প্রবীণ সাংবাদিক গাজী রুহুল আমিন। দেশের অগ্রগতি ও সংস্কৃতির বিকাশে এই গুণীজনদের অবদানকে সংসদ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।
এবারের সংসদীয় শোক প্রস্তাবে একটি ব্যতিক্রমী ও সংবেদনশীল বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা সমাজের অপরাধচিত্রের প্রতি সংসদের গভীর উদ্বেগ ও দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় অমানবিক ও নৃশংসভাবে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হওয়া চারজন নিষ্পাপ শিশুর অকাল ও নির্মম মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে জাতীয় সংসদ।
এই নিহত শিশুরা হলো—মিরপুরের শিশু রামিসা, চট্টগ্রামের ফাহিমা মিম এবং নরসিংদীর দুই শিশু আমিনা ও তাবাচ্ছুম আক্তার। সংসদ সদস্যরা এই কোমলমতি শিশুদের আত্মার শান্তি কামনা করার পাশাপাশি এই ধরনের জঘন্য ও সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা জোরদার করার প্রচ্ছন্ন তাগিদ দেন।
সংসদের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত কার্যপ্রণালী বিধি ও প্রথা অনুযায়ী, যেকোনো নতুন অধিবেশনের প্রথম দিনে সাবেক সংসদ সদস্য ও দেশের অগ্রযাত্রায় অবদান রাখা জাতীয় ব্যক্তিত্বদের স্মরণে এই আনুষ্ঠানিক শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা ও তা গ্রহণ করা হয়ে থাকে, যা এই বাজেট অধিবেশনেও সম্পূর্ণ মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সাথে সম্পন্ন হলো।
