করাচিতে আধাসামরিক বাহিনীর আঞ্চলিক সদর দপ্তরে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার তীব্র ও পাল্টা জবাব দিয়েছে পাকিস্তান। আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী একাধিক অঞ্চলে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী একযোগে ব্যাপক স্থল ও বিমান হামলা পরিচালনা করেছে। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার দাবি করেছেন, এই প্রতিশোধমূলক ও বিশেষ সাঁড়াশি অভিযানে অন্তত ২৯ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। তবে পাকিস্তানের এই দাবিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকার জানিয়েছে, ইসলামাবাদের সামরিক বাহিনীর এই নির্বিচার হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ৩৮ জন নিরপরাধ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, করাচি হামলার পরপরই পাকিস্তানের এই আচমকা সামরিক আগ্রাসনের ফলে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ভঙ্গুর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পারদ এখন চরম সীমায় পৌঁছেছে। দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘ সংঘাতময় সীমান্ত এলাকায় নতুন করে গভীর নিরাপত্তা উদ্বেগ ও চরম যুদ্ধ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। হামলার তীব্রতায় এবং পরবর্তী সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলোর স্থানীয় সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে।
করাচি হামলা ও পাকিস্তানের পাল্টা অভিযানের প্রেক্ষাপট
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত শনিবার, যখন পাকিস্তানের অন্যতম ব্যস্ত ও বৃহত্তম বন্দর নগরী করাচিতে দেশটির শক্তিশালী আধাসামরিক বাহিনী রেঞ্জার্সের আঞ্চলিক সদর দপ্তরে একদল সুসজ্জিত বন্দুকধারী অতর্কিত ও ভয়াবহ হামলা চালায়। ওই দিনের সেই রক্তক্ষয়ী ও আত্মঘাতী হামলায় পাকিস্তানের তিন রেঞ্জার্স সেনা সদস্য ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং আরও কয়েকজন গুরুতর আহত হন। রেঞ্জার্স সদর দপ্তরে হামলার এই ঘটনাটি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় প্রশাসনকে নাріїয়ে দেয় এবং দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে পুনরায় সামনে নিয়ে আসে।
করাচি হামলার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় Islamabad। শনিবারের ওই হামলার মোক্ষম জবাব দিতে এবং নিজেদের সামরিক সক্ষমতার জানান দিতে পরদিনই অর্থাৎ রবিবার পাকিস্তানের বিমান ও পদাতিক বাহিনী আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত জেলাগুলোতে একাধিক লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে একযোগে হামলা শুরু করে। পাকিস্তানি ফাইটার জেট এবং গানশিপ হেলিকপ্টারগুলো আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় পাকতিয়া, কুনার ও পাকতিকা প্রদেশে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে উপর্যুপরি বোমাবর্ষণ ও স্থল অভিযান চালায়।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ও দাবি
রবিবারের এই আকস্মিক ও সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক সুদীর্ঘ পোস্টে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, দেশজুড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সাম্প্রতিক হামলার জবাব হিসেবেই এই সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় কোনো ধরনের আপস করবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার আরও দাবি করেন, রবিবার দিনভর চালানো এই সুনির্দিষ্ট বিমান ও স্থল অভিযানে অন্তত ২৯ জন কুখ্যাত সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন, পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর নিখুঁত বোমাবর্ষণে সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় থাকা তালেবানের একাধিক গোপন আস্তানা মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সাথে সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিপুল পরিমাণ ভারী অস্ত্র, বিস্ফোরক এবং আধুনিক গোলাবারুদ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী। ఈ অভিযানের মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি পাকিস্তানের।
তালেবান সরকারের তীব্র প্রত্যাখ্যান ও পাল্টা অভিযোগ
অন্যদিকে, পাকিস্তানের এই সামরিক বিজয় ও সন্ত্রাসী দমনের দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে আন্তর্জাতিক মহলে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে আফগানিস্তানের ইসলামিক আমিরাত (তালেবান) সরকার। তালেবান প্রশাসনের কেন্দ্রীয় উপ-মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রীর দাবি এবং সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী কোনো সন্ত্রাসীর ওপর হামলা করেনি, বরং তারা আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের ওপর নগ্ন হামলা চালিয়েছে।
হামদুল্লাহ ফিতরাত গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আরও জানান, পাকিস্তানি ফাইটার জেটের নির্বিচার ও পৈশাচিক বোমা হামলায় মূলত সীমান্ত অঞ্চলের সাধারণ আফগান নাগরিকদের আবাসিক ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে। এই বর্বরোচিত হামলায় নিরীহ নারী এবং নিষ্পাপ শিশুসহ অন্তত ৩৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এছাড়া বোমাবর্ষণের কারণে আরও বহু মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের অনেকেরই অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। তালেবান মুখপাত্র এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়কে পাকিস্তানের এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
টিটিপি বিতর্ক ও দীর্ঘস্থায়ী সীমান্ত সংকট
ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখোয়া এবং বেলুচিস্তান প্রদেশে স্থানীয় পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে আত্মঘাতী ও গেরিলা হামলার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। Islamabad-এর কেন্দ্রীয় সরকারের দীর্ঘদিনের সরাসরি অভিযোগ, আফগানিস্তানের মাটিতে অবাধ আশ্রয় ও প্রশ্রয় পেয়ে গড়ে ওঠা সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান’ (টিটিপি) এই সমস্ত রক্তক্ষয়ী হামলার পেছনে মূল পরিকল্পনাকারী এবং অর্থায়নকারী হিসেবে জড়িত। পাকিস্তান দাবি করে আসছে যে, তালেবান ক্ষমতায় আসার পর টিটিপি আফগান মাটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তানে নাশকতা চালাচ্ছে।
তবে কাবুলের তালেবান নেতৃত্বাধীন প্রশাসন Islamabad-এর এই ধরনের গুরুতর অভিযোগ শুরু থেকেই অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে অস্বীকার করে আসছে[cite: 1]। তালেবান প্রশাসনের দাবি, আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ মাটি ব্যবহার করে প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রে বা বিশ্ব দরবারে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতে কাউকে বিন্দুমাত্র সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। দুই দেশের এই পারস্পরিক দোষারোপ এবং সাম্প্রতিক বিমান হামলার পর ডুরান্ড লাইনে নতুন করে অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করেছে উভয় দেশই, যা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ধরনের হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
