দেশের রাজনৈতিক সংস্কার ও জনদুর্ভোগ লাঘবের দাবিতে গতকাল শনিবার (২৭ জুন, ২০২৬) বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ময়মনসিংহ নগরের ঐতিহাসিক রেলওয়ে কৃষ্ণচূড়া চত্বরে এক বিশাল বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ১১ দলীয় রাজনৈতিক ঐক্যের ব্যানারে আয়োজিত এই সমাবেশে ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মী ব্যানার-ফেস্টুনসহ অংশ নেন। জামায়াতে ইসলামীর ময়মনসিংহ অঞ্চল পরিচালক মো. শাহাবুদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে প্রধান অতিথি এবং বিশেষ অতিথিদের বক্তব্যে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও ক্ষমতাসীনদের ‘একতরফা’ নীতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
টাকা দিয়ে জনগণের সম্মান কেনা যায় না: মামুনুল হক
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হক ক্ষমতাসীন বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে এক নজিরবিহীন ও কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, “ফ্যামিলি কার্ড কিংবা কৃষক কার্ড দেওয়া ভালো কথা, কিন্তু মনে রাখবেন—শুধুমাত্র টাকার বিনিময়ে দেশের জনগণের সম্মান ও রাজনৈতিক মর্যাদা আপনারা কিনতে পারবেন না। সাবেক স্বৈরশাসক শেখ হাসিনাও মনে করেছিলেন পদ্মা সেতু আর মেট্রোরেল দিয়েই বাংলাদেশের মানুষকে চিরতরে গোলাম বানিয়ে রাখবেন এবং মানুষ তাদের মর্যাদা বিকিয়ে দেবে। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে, বাংলার মানুষ না খেয়ে থাকতে পারে, তবুও তারা তাদের সম্মান ও গৌরব কোনো স্বৈরাচারীর পায়ের নিচে পিষ্ট হতে দেয় না।”
তিনি বিএনপিকে সতর্ক করে আরও বলেন:
“যদি আপনারা সেই বিপজ্জনক ও আত্মঘাতী পথে হাঁটেন, ফ্যামিলি কার্ড আর কৃষক কার্ডের মাধ্যমে যদি দেশের ৭০ ভাগ মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলবার চেষ্টা করেন, তবে মনে রাখবেন—যে পথে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা গিয়েছেন, সেই পথেই যেতে হবে তারেক জিয়াকে। স্বৈরাচারী পাকিস্তানি গোষ্ঠী যেভাবে ১৯৭০ সালে বাংলার মানুষের ভোটাধিকার মানতে চায়নি, ঠিক তেমনিভাবে ৩২টি রাজনৈতিক দলকে বাইরে রেখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কিছু লোকের যোগসাজশে ক্ষমতাসীন দল চোরাই পথে তাদের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চাইছে। জনগণের সংস্কারের অভিপ্রায়কে পায়ে দলবার চেষ্টা করলে তা বিএনপির জন্যই আত্মঘাতী হবে।”
ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং ও মিডিয়া ব্ল্যাকআউটের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ: মিয়া গোলাম পরওয়ার
সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার দেশের সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ম্যানিপুলেশন বা জালিয়াতির এক বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, “ক্ষমতায় এখন যারা আছেন (বিএনপি), তারা পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিরোধী দলকে পাত্তাই দিতে চান না। তারা মেজরিটি রুলকে ডেমোক্রেসি বলতে চান। অথচ এই নির্বাচনে বিএনপির আড়তদারদের লুকানো কিছু ‘গুপ্ত উপদেষ্টা’র মাধ্যমে ভয়াবহ ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। ফলাফল ম্যানিপুলেশন করে বিরোধী দলের অনেক নিশ্চিত বিজয়ী নেতাকে ইচ্ছে করে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
গোলাম পরওয়ার নির্বাচনী রাতের নাটকীয়তার বিবরণ দিয়ে বলেন:
“ভোটের দিন ১১ দলীয় জোট আমরা প্রায় ১৮০টির মতো আসন পেতে যাচ্ছিলাম এবং মিডিয়াতে সেই ফলাফল ঘোষণা হচ্ছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করে এক রহস্যময় নির্দেশে সমস্ত মিডিয়ায় ফলাফল ঘোষণা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর রেজাল্ট ম্যানিপুলেশন করে আমাদের (জামায়াত ও বিরোধী জোট) জোর করে বিরোধী দলের বেঞ্চে ঠেলে দেওয়া হলো। পরবর্তীতে সরকারের একজন উপদেষ্টাই তো স্বীকার করেছেন যে—তারা একটি নির্দিষ্ট দলকে (জামায়াত) মেইনস্ট্রিমে আসতে দেননি।”
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, জুলাই আন্দোলনের রক্তাক্ত চেতনা ও দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থেই ৩ দলের শীর্ষ নেতা এবং বর্তমান সংসদের বিরোধী দলীয় নেতার (লিডার অব দ্য অপজিশন) অনুরোধে অনেক কষ্ট বুকে চেপে তারা এই ফলাফল মেনে নিয়েছিলেন। তবে সরকার যদি অতিসত্বর প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির চীন-মালয়েশিয়া সফরের সমস্ত গোপন চুক্তি সংসদকে না জানায় এবং দ্রব্যমূল্যসহ সব সমস্যার সমাধান না করে, তবে শতভাগ মানুষের এই আন্দোলনকে আবারও রাজপথে নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
জনগণের সাথে প্রতারণা ও পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা: আসিফ মাহমুদ
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “নির্বাচনের আগে যিনি এখন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তিনি নিজেই বলেছিলেন দেশের মানুষ যেন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়। কিন্তু নির্বাচনের পর সেই গণভোটের রায় কার্যকর করার জন্য যে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করার কথা ছিল, তার শপথ তারা নিলেন না। এই জাতির সঙ্গে দিনে-রাতে প্রতারণা করে তারা সরকার চালাচ্ছেন।”
তিনি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক খাত ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরে বলেন:
- অর্থনৈতিক বিপর্যয়: বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতন কেবল গুম-খুনের জন্য হয়নি, বরং দুর্নীতি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে হয়েছিল। বর্তমান সরকারও ৪-৫ মাসের মাথায় বিদ্যুত ও তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণে বাড়িয়ে সাধারণ মেহনতি মানুষকে দেউলিয়া করে দিচ্ছে। যে বাজার আগে ১০০ টাকায় হতো, তা এখন ১৫০ টাকায় করতে হচ্ছে।
- পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যর্থতা: প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি মালয়েশিয়া ও চীন সফর করে আসলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ওনার পেজে অনেক গান-টান শোনা গেল, কিন্তু ৩ বছর ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণাই তিনি আনতে পারলেন না। এই ব্যর্থতার জবাব জনগণকে দিতে হবে।
সমাবেশের অন্যান্য শীর্ষ নেতৃবৃন্দ:
উক্ত বিভাগীয় সমাবেশে সরকারের দমননীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংহতি প্রকাশ করে আরও বক্তব্য রাখেন—বাংলাদেশ নেজামে ইসলামের ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুল কাইয়ুম সোবহানী, খেলাফত মজলিসের আমির আবদুল বাছিত আজাদ, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিয়াজী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম। এছাড়াও স্থানীয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে ময়মনসিংহ-২ আসনের মুহাম্মদুল্লাহ এবং ময়মনসিংহ-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুল হাসান সমাবেশে উপস্থিত থেকে একাত্মতা ঘোষণা করেন।
