ভারতের কর্নাটক রাজ্যের বেঙ্গালুরুর একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট থেকে ব্যবসায়ী বৈশাখ উপাধ্যায়ের লাশ উদ্ধারের পর থেকে দক্ষিণ ভারতীয় শোবিজ দুনিয়ায় চরম শোরগোল ও রহস্যের দানা বেঁধেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪৫ বছর বয়সী ব্যবসায়ী বৈশাখ উপাধ্যায় ছিলেন অভিনেত্রী কৃষি থাপান্ডার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। গত বুধবার (২৪ জুন, ২০২৬) রাতে রাজরাজেশ্বরী নগরের ‘এলিগ্যান্ট টেনেস’ (Elegant Terrace) অ্যাপার্টমেন্টে অবস্থিত অভিনেত্রীর নিজস্ব ফ্ল্যাট থেকেই তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়।
মৃত্যুর আগে অভিনেত্রীকে ফোন ও মেসেজ, চাবি নিয়ে রুদ্ধশ্বাস দৌড়
পুলিশি তদন্ত ও প্রাথমিক এজাহার থেকে জানা যায়, ঘটনার দিন রাতে অভিনেত্রী কৃষি থাপান্ডা বেঙ্গালুরুর মূল ফ্ল্যাটে ছিলেন না, তিনি ব্যক্তিগত কাজে নেলামঙ্গলায় (Nelamangala) অবস্থান করছিলেন। ওই ফ্ল্যাটটিতে বৈশাখ ও কৃষি উভয়ের কাছেই আলাদা দুটি ডুপ্লিকেট চাবি ছিল এবং মৃত্যুর আগে বৈশাখ ওই ফ্ল্যাটেই অবস্থান করছিলেন।
বুধবার রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে বৈশাখ হুট করে কৃষিকে ফোন করেন এবং মোবাইল মেসেজে নিজের আত্মহত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানান। ফোনে এই চরম বার্তা পেয়ে নেলামঙ্গলা থেকে আঁতকে ওঠেন অভিনেত্রী। তিনি বৈশাখকে ফোনে বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন এবং দ্রুত নিজের গাড়ি নিয়ে বেঙ্গালুরুর ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। দ্রুতগতিতে ফ্ল্যাটে পৌঁছে নিজের চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই ড্রয়িংরুমে বৈশাখকে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান কৃষি।
হতবিহ্বল অভিনেত্রী তাৎক্ষণিকভাবে ফ্ল্যাটের মালিককে বিষয়টি জানান। পরবর্তীতে মধ্যরাতের দিকে ফ্ল্যাটের মালিক পুলিশ কন্ট্রোল রুমে (PCR) ফোন করলে রাজরাজেশ্বরী নগর থানার পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে। পুলিশ একই সাথে বৈশাখের স্ত্রীকেও খবর দেয়।
বিষণ্নতা, দাম্পত্য কলহ নাকি কোটি টাকার চাঁদাবাজি মামলা?
ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ কোনো সুইসাইড নোট উদ্ধার করতে পারেনি। তবে লাশের প্রাথমিক সুরতহাল দেখে পুলিশের ধারণা এটি একটি আত্মহত্যার ঘটনা। ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি বেঙ্গালুরুর ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পুলিশি অনুসন্ধান ও পারিবারিক সূত্রে বৈশাখের আত্মহত্যার পেছনে তিনটি বড় কারণ সামনে আসছে:
- তীব্র মানসিক বিষণ্নতা: বৈশাখ দীর্ঘদিন ধরে গভীর মানসিক বিষণ্নতা বা ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনে ভুগছিলেন এবং এর জন্য তিনি নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ ও থেরাপি নিচ্ছিলেন।
- দাম্পত্য কলহ: পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহের জেরে গত প্রায় এক মাস ধরে বৈশাখ তাঁর স্ত্রীর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা থাকছিলেন, যা তাঁর মানসিক অবস্থাকে আরও ভঙ্গুর করে তোলে।
- কোটি টাকার চাঁদাবাজি মামলা: বৈশাখ শুধুমাত্র পারিবারিক কারণেই বিপর্যস্ত ছিলেন না, বরং বেঙ্গালুরুর হাই-প্রোফাইল ব্যবসায়ী ও আইনজীবী অরবিন্দ রেড্ডিকে ঘিরে আলোচিত একটি চাঁদাবাজি ও হুমকিমূলক চিঠির মামলায় পুলিশের কড়া নজরদারিতে ছিলেন। গত ফেব্রুয়ারি মাসে কুরিয়ারের মাধ্যমে আইনজীবী অরবিন্দ রেড্ডির কাছে ৬ থেকে ৭ কোটি টাকা দাবি করে একটি কাফন ও হুমকির চিঠি পাঠানো হয়েছিল। কর্নাটক পুলিশের সিসিবি (CCB) তদন্তে এই চাঁদাবাজ চক্রের সাথে বৈশাখের সরাসরি নাম ও সম্পৃক্ততা উঠে আসে।
লাশের কাছে অভিনেত্রীকে বাধা, তুমুল বাকবিতণ্ডা
এদিকে লাশ উদ্ধারের পর ফ্ল্যাট প্রাঙ্গণে এক অদ্ভুত ও থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পুলিশ ও বৈশাখের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত হওয়ার পর অভিনেত্রী কৃষি থাপান্ডাকে মরদেহের কাছে যেতে বাধা দেওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, এই সময় অভিনেত্রীর সাথে উপস্থিত বৈশাখের আত্মীয়দের তীব্র বাকবিতণ্ডা ও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। এটি পরিবারের পক্ষ থেকে অভিনেত্রীর ওপর ক্ষোভ নাকি অন্য কোনো আইনি জটিলতা—তা এখনও পুলিশ পরিষ্কার করেনি। তবে ‘বিগ বস কন্নড়’ দিয়ে তুমুল জনপ্রিয়তা পাওয়া এই অভিনেত্রী আর কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না করে অশ্রুসজল চোখে সেখান থেকে নীরবে চলে যান।
রাজরাজেশ্বরী নগর থানার পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। বৈশাখের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি অপমৃত্যু বা প্ররোচনার মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
