রফতানি আয় ১৫০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য: বাণিজ্যমন্ত্রীর কর্মপরিকল্পনা ও চ্যালেঞ্জ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে যখন বন্ড ও ভ্যালু অ্যাডের শর্ত নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে নানা শঙ্কা তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই দেশের রফতানি বহুমুখীকরণ (Export Diversification) নিয়ে সরকারের এক মেগা পরিকল্পনার কথা জানালেন বাণিজ্যমন্ত্রী। সম্প্রতি ঢাকায় আয়োজিত ‘খসড়া উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা’ (DPP) বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের নীতি নির্ধারণী সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এসব কথা বলেন। সভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় স্বনামধন্য অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‍্যাপিড (RAPID) রফতানি বাড়াতে এবং এলডিসি পরবর্তী ঝুঁকি মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ ও গবেষণা তথ্য তুলে ধরে।

স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) কাতার থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণ চলতি ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে ঘটার কথা থাকলেও, জাতিসংঘে করা সরকারের বিশেষ আবেদনের প্রেক্ষিতে আরও তিন বছর অর্থাৎ ২০২৯ সাল পর্যন্ত এই অন্তর্বর্তীকালীন গ্রেস পিরিয়ড বা অতিরিক্ত সময় পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করছে সরকার। তবে এই অতিরিক্ত ৩ বছর সময়কে যদি আমরা অলস বসে থেকে হেলায় হারাই এবং যথাযথ হোমওয়ার্ক না করি, তবে উত্তরণের সুফল মিলবে না বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক।

র‍্যাপিডের মূল গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের একক তৈরি পোশাকের বাজার হিস্যা বা শেয়ার অনেক বেশি। ফলে এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) মর্যাদাপূর্ণ ‘জিএসপি প্লাস’ (GSP+) সুবিধা পেলেও বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত সুরক্ষামূলক কাস্টমস শুল্ক সুবিধা (Safeguard Tariff) নাও পেতে পারে। এ ছাড়া তৈরি পোশাকের পাশাপাশি বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ক্ষেত্রে ভারত, ইউরোপ ও চীনের বাজারে রফতানি খাতভেদে ০.২ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১২৭ শতাংশ পর্যন্ত ধসে যাওয়ার তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে।

সভায় র‍্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ড. এম আবু ইউসুফ জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে কৃষি ও উৎপাদন খাত মিলিয়ে বার্ষিক ১ মিলিয়ন (১০ লাখ) ডলারের বেশি রফতানি করে—এমন সম্ভাবনাময় পণ্যের সংখ্যা ১ হাজার ৩৯৪টি। তিনি বলেন, “পোশাকের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে এই ১ হাজার ৩৯৪টি খাতের যৌক্তিক ও স্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে। একই সাথে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নিয়ম অনুযায়ী এলডিসি উত্তরণের পর সরাসরি নগদ রফতানি প্রণোদনা বা ক্যাশ সাবসিডি দেওয়া যাবে না, তাই এখন থেকেই প্রণোদনার বিকল্প কোনো স্মার্ট সহায়তা ব্যবস্থা নিয়ে এনবিআর ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে পলিসি তৈরি করতে হবে।”

রফতানি বাড়াতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অপরিকল্পিত ও অবাস্তব প্রকল্প বাস্তবায়নের তীব্র সমালোচনা করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন:

“বিগত সরকারের আমলের মতো কেবল কাগজে-কলমে প্রকল্প দেখালে চলবে না; আমাদের মাঠপর্যায়ে বাস্তবভিত্তিক ও ব্যবসাবান্ধব বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। দেশের পাট ও চামড়া খাতের আধুনিকায়নে আমরা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সহায়তা নিচ্ছি। একটি সুখবর হলো—মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন গুরুত্বপূর্ণ চীন সফরে বাংলাদেশের পাটশিল্পের বৈপ্লবিক উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে চীনের সঙ্গে একটি মেগা সমঝোতা স্মারক (MoU) সই হতে যাচ্ছে।”

বাণিজ্যমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, “চলতি ২০২৬ সালের নভেম্বরে না হলেও আগামী তিন বছরের মধ্যে (২০২৯ সালের ভেতর) বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটবেই, এটি নিশ্চিত। তাই এলডিসি পরবর্তী সম্ভাব্য সব ধরণের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ধাক্কা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের এখন থেকেই কোমর বেঁধে প্রস্তুতি নিতে হবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *