বন্ড সুবিধার নতুন শর্তে শঙ্কায় সংযোগ শিল্প, বিনিয়োগ ও স্থানীয় উৎপাদনে আশঙ্কার মেঘ

বিশ্ববাজারে দেশীয় রফতানিজাত পণ্যের দাম প্রতিযোগিতামূলক রাখা এবং উৎপাদনকারীদের মূলধনের ওপর চাপ কমাতে সরকার বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা দিয়ে থাকে। এই সুবিধার আওতায় শতভাগ রফতানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে কোনো শুল্ক বা কর দিতে হয় না। বর্তমানে প্রচলিত নিয়মে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বন্ড সুবিধায় আনা কাঁচামাল দিয়ে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদনে ন্যূনতম ২০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজন বা দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহারের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

তবে প্রস্তাবিত নতুন বাজেটে এই ২০ শতাংশের শর্তটি পুরোপুরি বিলুপ্ত করার প্রস্তাব এনে বলা হয়েছে—আমদানিকৃত কাঁচামালের খরচের চেয়ে রফতানি আয় বেশি হলেই বন্ডের শর্ত পূরণ হয়েছে বলে গণ্য হবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে দেশের উদীয়মান শিল্পখাতের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ও পরস্পরবিরোধী বলে মনে করছেন স্থানীয় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের শীর্ষ সংগঠনগুলো।

এই নীতি পরিবর্তনের ফলে দেশীয় শিল্পে নতুন বিনিয়োগ থমকে যাওয়ার পাশাপাশি বিদেশে অর্থ পাচারের এক নতুন রুট তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন খোদ খাতের শীর্ষ নেতারা।

  • বিটিএমএর ক্ষোভ ও অর্থ পাচারের আশঙ্কা: বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (BTMA) ভারপ্রাপ্ত সহ-সভাপতি সালেউদ জামান খান ইটিসি বাংলাকে বলেন, “এই শর্ত তুলে দেওয়ার ফলে বাংলাদেশ থেকে মানি লন্ডারিং (Money Laundering) ও বন্ডের অপব্যবহার জ্যামিতিক হারে বাড়বে। কারণ তখন নামমাত্র রফতানি দেখিয়ে বিদেশ থেকে সম্পূর্ণ তৈরি বা আংশিক তৈরি পণ্য এনে স্থানীয় খোলা বাজারে বিক্রি করে দেওয়া সহজ হবে, যা দেশীয় সুতা ও কাপড় কলগুলোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।” অন্যদিকে বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল প্রশ্ন তোলেন, “বিগত ৩০ বছর ধরে এই শর্ত কার্যকর ছিল না, তাহলে হঠাৎ করে কেন এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে যা দীর্ঘমেয়াদী দেশীয় বিনিয়োগকে সরাসরি নিরুৎসাহিত করবে।”
  • আইনি জটিলতার শঙ্কা বিজিএমইএর: বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (BGME) পরিচালক রশিদ আহমেদ হোসাইনী বলেন, “আইনের ধারা ও বন্ডের নীতিমালা সবসময় স্পষ্ট হওয়া উচিত। আগে যেখানে খাতভেদে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ভ্যালু অ্যাড ছিল, তা এখন হঠাৎ জিরো বা তুলে দেওয়া হলে এর আইনি ব্যাখ্যা নিয়ে কাস্টমস বন্ড ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক তৈরি হবে এবং জটিলতা বাড়বে।”

যেখানে নতুন আমদানি নীতিতে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের হার ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল, সেখানে বাজেটে তা শূন্য করার প্রস্তাবকে সম্পূর্ণ ‘পরস্পরবিরোধী’ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বৈশ্বিক বাজারের দিকে তাকালে দেখা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশি পণ্যের বড় বাজার কানাডায় ৬০ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ৫০ শতাংশ এবং ভারতের বাজারে প্রবেশাধিকার পেতে অন্তত ৪০ শতাংশ লোকাল ভ্যালু অ্যাডের শর্ত রয়েছে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) কাতার থেকে চূড়ান্তভাবে উত্তরণ লাভ করবে, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) মর্যাদাপূর্ণ ‘জিএসপি প্লাস’ (GSP+) শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশকে বাধ্যতামূলকভাবে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজন নিশ্চিত করতে হবে।

পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মো. মাজেদুল হক এই বিষয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণে বলেন:

“সরকারের বন্ড বা কর রেয়াত সুবিধা এমন সুনির্দিষ্ট কাঠামোর ওপর হতে হবে যা কেবল রফতানি খাতকে প্রতিযোগিতামূলকই করবে না, বরং একই সাথে দেশের অভ্যন্তরীণ কাঁচামাল শিল্পকে শক্তিশালী করবে। ভ্যালু অ্যাডের শর্ত শিথিল করলে সাময়িক সুবিধা হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে বা ভবিষ্যতে দেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়াতে কোনো কাজে আসবে না।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *