‘জিনে নিয়ে গেছে’ বলে নাটক, ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা নবজাতককে ২২ দিন পর উদ্ধার

অর্থনৈতিক সংকটের কথা বলে নিজের এক মাস বয়সী কন্যাশিশুকে মাত্র ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে এক বাবার বিরুদ্ধে। ঘটনার সত্যতা গোপন রাখতে তিনি নিজের স্ত্রীকে জানান, নবজাতক শিশুটিকে ‘জিন-পরি নিয়ে গেছে’। এমনকি বিষয়টিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে বাড়িতে ওঝা-কবিরাজ ডেকে ঝাড়ফুঁকের ব্যবস্থাও করেন তিনি। অবশেষে ঘটনার ২২ দিন পর পুলিশের অভিযানে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং তাকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে মাগুরা সদর উপজেলার বেরইল পলিতা ইউনিয়নের রামদেরগাতী এলাকায়। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) রাত ৮টায় মাগুরার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেন পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন।

পুলিশ জানায়, গত ২৭ মে, পবিত্র ঈদুল আজহার আগের দিন, রামদেরগাতী এলাকার বাসিন্দা সাগর হোসেন (৩৪) তার নবজাতক কন্যা টুকটুকিকে বিক্রি করে দেন। ক্রেতা ছিলেন সদর উপজেলার দক্ষিণ বীরপুর এলাকার বাসিন্দা মো. শাহাবুর (২৮) ও মনিরা খাতুন (২৫) দম্পতি। ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে একটি স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে এই অবৈধ লেনদেন সম্পন্ন হয়।

তদন্তে জানা গেছে, শিশুটিকে দত্তক নেওয়ার নামে বিক্রির পুরো প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অন্তত তিনজন ব্যক্তি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন জানান, সন্তান বিক্রির সময় সাগর হোসেন একাধিক প্রতারণামূলক কৌশল অবলম্বন করেন। ক্রেতা দম্পতির সামনে তিনি অন্য এক নারীকে নিজের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে দাবি করেন, তার প্রকৃত স্ত্রী ক্যানসারে আক্রান্ত এবং চিকিৎসার ব্যয় মেটাতেই তিনি সন্তান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।

অন্যদিকে, নিজের স্ত্রী তানজিলা খাতুনের কাছে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প উপস্থাপন করেন। স্ত্রীকে তিনি জানান, তাদের নবজাতক সন্তানকে ‘জিন-পরি নিয়ে গেছে’। পরে জিনের মাধ্যমে শিশুটিকে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়ে দিনের পর দিন সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। বিষয়টিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে বাড়িতে ওঝা ও কবিরাজ এনে ঝাড়ফুঁকের আয়োজনও করা হয়।

প্রায় তিন সপ্তাহ পার হলেও শিশুটির কোনো সন্ধান না পেয়ে মা তানজিলা খাতুন চরম উদ্বেগ ও মানসিক কষ্টে ভুগতে থাকেন। অবশেষে তিনি বিষয়টি স্থানীয় শত্রুজিৎপুর পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) শুভংকর রায়ের কাছে তুলে ধরেন।

অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং স্থানীয় সূত্রের মাধ্যমে অনুসন্ধান শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টার দিকে দক্ষিণ বীরপুর এলাকায় শাহাবুর ও মনিরা দম্পতির হেফাজত থেকে নবজাতক টুকটুকিকে উদ্ধার করা হয়। পরে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে শিশুটিকে তার মায়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, “দারিদ্র্য বা আর্থিক সংকট কখনোই সন্তান বিক্রির বৈধ কারণ হতে পারে না। এটি একটি জঘন্য, অমানবিক এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনতে কাজ করছি।”

তিনি আরও জানান, ক্রেতা দম্পতির আর্থিক অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। তারা দাবি করেছেন, একটি গরু বিক্রি করে শিশুটিকে কিনেছেন। তবে শিশুটিকে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে, বিশেষ করে পাচার বা অবৈধ দত্তক বাণিজ্যের অংশ হিসেবে কেনা হয়েছিল কি না, তা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।

পুলিশ ইতোমধ্যে শিশুটির বাবা সাগর হোসেন, ক্রেতা দম্পতি শাহাবুর ও মনিরা এবং লেনদেনে জড়িত কয়েকজন মধ্যস্থতাকারীকে হেফাজতে নিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

এদিকে সন্তান ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শিশুটির মা তানজিলা খাতুন। তিনি জানান, তাদের পরিবারে এর আগে আরও দুটি সন্তান রয়েছে। তৃতীয় সন্তানের জন্মের মাত্র ১৩ মাস আগে দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয়েছিল। অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি সিজারিয়ান অপারেশনের কারণে তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। সেই সঙ্গে পরিবারটি আর্থিক সংকটেও ভুগছিল।

তানজিলা বলেন, “যত কষ্টই হোক, কোনো মা তার সন্তান অন্যের হাতে তুলে দিতে চায় না। আমার স্বামী বড় ভুল করেছে। আমি শুধু আমার সন্তানকে ফিরে পেয়েছি, এটাই সবচেয়ে বড় কথা।”

ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়দের দাবি, এমন অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভবিষ্যতে কেউ আর অর্থের বিনিময়ে শিশু বিক্রির মতো নৃশংস কাজে জড়াতে সাহস পাবে না।

মানবাধিকারকর্মীরাও বলছেন, শিশু বিক্রি ও অবৈধ দত্তক বাণিজ্যের মতো ঘটনা সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন নাগরিকদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *