বর্তমান সরকার একটি জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী, দক্ষতাভিত্তিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশ বিশ্বে একটি সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের সমাজ পরিবর্তনের অগ্রদূত ও রোল মডেল হিসেবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
রোববার (৭ জুন) সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘কর্মমুখী ও টেকনিক্যাল শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ’ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের বিপুল ছাত্র ও যুবসমাজকে প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে বাংলাদেশ কেবল অর্থনৈতিকভাবেই নয়, জ্ঞান ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও বিশ্বে অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে উঠবে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান বিশ্ব দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে এবং এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হতে হবে। কেবল প্রযুক্তি নয়, মানবিক গুণাবলি ও নৈতিকতা একজন শিক্ষার্থীকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তি ও মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলা ও ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা যদি তৃতীয় একটি আন্তর্জাতিক ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে পারে, তাহলে দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বৃদ্ধি পাবে। বর্তমান বৈশ্বিক শ্রমবাজারে ভাষাগত দক্ষতা একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীদের বহুভাষিক দক্ষতা অর্জনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী সনদনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি বলেন, শুধু ডিগ্রি অর্জন করলেই চলবে না, শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য দক্ষতা অর্জন করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর, বাস্তবমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থাই আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রধান হাতিয়ার।
তিনি বলেন, একটি জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে শিক্ষা, গবেষণা, সৃজনশীলতা, উদ্ভাবন এবং যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করা হবে। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টির বিকল্প নেই।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন এবং আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তারের বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের এই যুগে প্রচলিত শিক্ষা কারিকুলামকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার্থীদের এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে তারা ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারে।
দেশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন থেকে শুরু করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিটি পর্যায়ে অসংখ্য মানুষ আত্মত্যাগ করেছেন। তাঁদের অবদানকে যথাযথ সম্মান জানাতে হলে শিক্ষায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানে এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতায় জাতিকে এগিয়ে নিতে হবে।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এই সময়ে নিজেদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া উন্নয়নের বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে বিশ্বমানের নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
উচ্চশিক্ষা বিস্তারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের দুই হাজারেরও বেশি অধিভুক্ত কলেজে প্রায় ৪০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সংকট নিরসনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
তিনি স্মরণ করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং কর্মমুখী উচ্চশিক্ষা বিস্তারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, একজন শিক্ষক কেবল পাঠদানকারী নন; তিনি সমাজ গঠনের কারিগর। শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম। তাই শিক্ষকদের নিজেদের দক্ষতা ও জ্ঞানের পরিধি আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন কলেজের শিক্ষক, শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। কর্মমুখী ও টেকনিক্যাল শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজিত এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও যুগোপযোগী ও বাস্তবমুখী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা।
