ময়লার ভাগাড়ে পরিণত শীতলক্ষ্যা ওয়াকওয়ে, সন্ধ্যা নামলেই ছিনতাই-মাদকের আতঙ্ক

নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে পথচারীদের জন্য নির্মিত ওয়াকওয়ে বর্তমানে অব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে বেহাল অবস্থায় রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, ভাঙা রেলিং এবং বড় বড় গর্তের কারণে ওয়াকওয়েটি চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর এখানে মাদক বেচাকেনা ও ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে। দ্রুত সংস্কার এবং নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।

এদিকে, ওয়াকওয়ের অবকাঠামোগত সংস্কার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং জেলা পুলিশ।

ময়লার স্তূপে নষ্ট হচ্ছে নদীতীরের পরিবেশ

গত বুধবার (৩০ জুন) শীতলক্ষ্যা নদীর টানবাজার ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীর তীরে নির্মিত ওয়াকওয়ের বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমে রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রলি ও গাড়িতে করে এখানে বর্জ্য ফেলা হয়। এতে দুর্গন্ধে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের হাঁটা কিংবা অবসর কাটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

ওয়াকওয়ের সিঁড়িতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন নজরুল ইসলাম নামে এক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। তিনি বলেন, শান্ত পরিবেশে কিছু সময় কাটানোর উদ্দেশ্যে নদীর পাড়ে এলেও চারপাশের ময়লা ও দুর্গন্ধে সেখানে বসে থাকাই কষ্টকর হয়ে উঠেছে। নিয়মিত বর্জ্য অপসারণের পাশাপাশি এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

ভাঙা রেলিং ও গর্তে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে নারায়ণগঞ্জ শহরের ৫ নম্বর ঘাট থেকে নিতাইগঞ্জ খালঘাট পর্যন্ত প্রায় পুরো ওয়াকওয়েতেই দেখা গেছে একই চিত্র। বিভিন্ন স্থানে রেলিং ভেঙে পড়েছে, কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয়েছে বড় গর্ত। এতে পথচারীদের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নদীতীর দখলমুক্ত রাখা, পরিবেশ সংরক্ষণ, সৌন্দর্যবর্ধন এবং মানুষের অবসর বিনোদনের সুযোগ তৈরি করতে বিআইডব্লিউটিএ এই ওয়াকওয়ে নির্মাণ করে। একই সঙ্গে নদীর দুই তীরে বৃক্ষরোপণ ও দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল। তবে কয়েক বছরের মধ্যেই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, ২০১৪ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর দুই তীরে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে শহরের ৫ নম্বর ঘাট থেকে নিতাইগঞ্জ খালঘাট এবং সিদ্ধিরগঞ্জ অংশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নিম্নমানের নির্মাণ ও রশি বাঁধার অভিযোগ

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পণ্যবাহী জাহাজ ও ট্রলারের রশি ওয়াকওয়ের রেলিংয়ের সঙ্গে বেঁধে রাখার কারণে অনেক রেলিং ভেঙে গেছে। পাশাপাশি নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণেও অবকাঠামো দ্রুত নষ্ট হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।

সন্ধ্যার পর বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা

ওয়াকওয়ের পাশে সদর থানা এবং একটি পুলিশ ক্যাম্প থাকা সত্ত্বেও সন্ধ্যার পর এলাকাটি ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারিদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য ওয়াকওয়েটি নিরাপদ নয়।

স্থানীয়দের দাবি, নিয়মিত পুলিশ টহল, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, সিসিটিভি স্থাপন এবং দ্রুত সংস্কারের মাধ্যমে ওয়াকওয়েটিকে আবারও নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন জনপরিসরে পরিণত করা হোক।

সংস্কারের আশ্বাস বিআইডব্লিউটিএর

বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ওয়াকওয়ের রেলিংয়ে জাহাজ বা নৌযানের রশি বাঁধা বন্ধে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগও চলছে।

তিনি জানান, যেসব স্থানে ওয়াকওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো সংস্কারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত সুপারিশ পাঠানো হবে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

টহল ও অভিযানের কথা জানাল পুলিশ

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী জানান, মাদক ও ছিনতাই প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে একাধিক অভিযানে মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, শীতলক্ষ্যা তীরের ওয়াকওয়েতে নিয়মিত পুলিশ টহল জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুরো নারায়ণগঞ্জ শহরকে ধাপে ধাপে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত সংস্কার, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণ এবং কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরের এই ওয়াকওয়ে আবারও নগরবাসীর নিরাপদ ও মনোরম অবসরযাপনের স্থানে পরিণত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *