ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছয় দিনব্যাপী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানী তেহরানে শুরু হতে যাচ্ছে। আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার চার মাসেরও বেশি সময় পর শুরু হওয়া এই আনুষ্ঠানিকতাকে ইরানি কর্মকর্তারা ‘শতাব্দীর সেরা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’ বলে অভিহিত করছেন। ঐতিহাসিক এই আয়োজনে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ থেকে দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে বলে ধারণা করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। ইরানের ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের জন্য এর আগে কখনো এত বিশাল পরিসরে প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি’র এক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
বিশাল এই সমাগম ও ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের জন্য ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) তেহরানভিত্তিক প্রধান প্রাদেশিক ইউনিট ‘মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ কোর’ পুরো কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে শোকাহত মানুষদের জন্য হাজারো সেবাকেন্দ্র (মাওকিব), ১০ লাখের বেশি দর্শনার্থীর আবাসন এবং জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের জন্য তেহরানের কেন্দ্রস্থলজুড়ে সুনির্দিষ্ট পথ নির্ধারণ করা হয়েছে। জানাজার জন্য ইরানি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রতীক হিসেবে ‘মুষ্টিবদ্ধ হাত’ আর মূল স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে—‘আমাদের জেগে উঠতেই হবে’।
ছয় দিনের মূল কর্মসূচিতে যা যা থাকছে:
- শনিবার থেকে রবিবার (৪-৫ জুলাই): তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় স্থানীয় সময় সকাল ৬টায় ছয় দিনের এই আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। রবিবার বিকেল পর্যন্ত সাধারণ মানুষ সেখানে গিয়ে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন। মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ কোরের কমান্ডার হাসান হাসানজাদেহ জানান, খামেনির কফিন একটি উঁচু মঞ্চে রাখা হবে এবং দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে প্রত্যেকে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষ করতে পারেন।
- মঙ্গলবার (৭ জুলাই): এই দিন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন তেহরানের দক্ষিণে অবস্থিত পবিত্র কোম শহরে স্থানান্তরিত করা হবে। সেখানে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান জামকারান মসজিদে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে ইমামতি করবেন শিয়াদের জ্যেষ্ঠ আলেম।
- বুধবার (৮ জুলাই): খামেনির মরদেহ বিমানযোগে ইরাকের নাজাফে নেওয়া হবে। সেখানে অন্ত্যেষ্টিযাত্রার পর কারবালায় ইসলামের চতুর্থ খলিফা ও শিয়া মুসলিমদের প্রথম ইমাম হযরত আলী (রা.)-এর সমাধিস্থলে বিশেষ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হবে। এরপর মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে।
- বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই): খামেনিকে তার জন্মশহর মাশহাদে দাফন করা হবে। শিয়া ইসলামের অষ্টম ইমামের সমাধিস্থল এবং ইরানের সবচেয়ে পবিত্র তীর্থস্থান ‘ইমাম রেজা’-র সমাধিসৌধ প্রাঙ্গণে তাকে সমাহিত করা হবে।
রাজনৈতিক গুরুত্ব ও অমীমাংসিত প্রশ্ন:
বিশ্লেষকদের মতে, এই শেষকৃত্য কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এর গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। চলমান অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে এই আয়োজনকে ইরানি রাষ্ট্র নিজেদের রাজনৈতিক বয়ান শক্তিশালী করা এবং ঐক্যের বার্তা দেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখছে। এটি খামেনি-পরবর্তী ক্ষমতার কাঠামো সুসংহত করা এবং তার ছেলে ও সম্ভাব্য উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির প্রতি সমর্থন জোরদার করার একটি প্রতীকী মঞ্চ হতে পারে।
তবে এই মহাসমাবেশ ইরানের ভেতরের গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন কতটা দূর করতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেক পর্যবেক্ষক। এছাড়া এত বড় আয়োজনের মাঝেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো রহস্যে ঘেরা। বিশেষ করে, গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে খামেনির ছেলেদের আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। তাছাড়া, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এক হামলায় মোজতবা খামেনির স্ত্রীসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হওয়ার খবরের পর থেকে মোজতবার শারীরিক অবস্থা নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। ফলে এই দাফন অনুষ্ঠানে মোজতবা খামেনি ও তার ভাইবোনেরা উপস্থিত থাকবেন কি না, তা নিয়ে ব্যাপক কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি, জানাজার নামাজে মূল ইমামের দায়িত্ব কে পালন করবেন—সেই সিদ্ধান্তটিও ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সমীকরণ নির্ধারণে একটি বড় ইঙ্গিত দেবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এই ঐতিহাসিক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে কয়েক ডজন দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পার্লমেন্টের স্পিকার এবং মন্ত্রীরা তেহরানে সমবেত হচ্ছেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও এই জানাজায় যোগ দিতে ইতিমধ্যে তেহরানে পৌঁছেছেন। প্রায় ৮০০ জন আন্তর্জাতিক সাংবাদিক এই অনুষ্ঠানটি সরাসরি কভার করার জন্য উপস্থিত থাকছেন। দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর ইরানজুড়ে আরও ৪০ দিন সরকারিভাবে শোকানুষ্ঠান চলবে।
