বিশ্বকাপের মঞ্চে ঝলক ছড়ানোর আগে শাকিরার সৌন্দর্য ও ফিটনেসের গোপন রুটিন

বিনোদন: ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের সেই কালজয়ী ও অবিশ্বাস্য সফল থিম সং ‘ওয়াকা ওয়াকা’র (Waka Waka) পর আবারও ফুটবলের বিশ্বমঞ্চ মাতাতে সুরে সুরে ফিরলেন কলম্বিয়ান সুপারস্টার ও পপ সংস্কৃতির জীবন্ত কিংবদন্তি শাকিরা। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের অফিশিয়াল থিম সং ‘দাই দাই’ (Dai Dai)-তে এবার সুর মিলিয়েছেন এই লাতিন পপ সাম্রাজ্ঞী। গানটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উন্মোচনের পর থেকেই বিশ্বব্যাপী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রিলস, টিকটক ও ইউটিউব শর্টসে ট্রেন্ডিংয়ের শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে এবং ইতিমধ্যে কোটি কোটি ফুটবল ও সংগীতপ্রেমী ভক্তের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে

তবে শাকিরা শুধু তার কণ্ঠের জাদুকরী ক্ষমতা আর মঞ্চ কাঁপানো দুর্দান্ত নাচের মুদ্রার জন্যই স্টেজের আলো নিজের দিকে টেনে নেন না; পাশাপাশি এই ৪৯ বছর বয়সী কলম্বিয়ান গায়িকার নিখুঁত, উজ্জ্বল ও চিরযৌবনা ত্বকও সমানভাবে দর্শকের নজর কাড়ে। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বজুড়ে তার কোটি কোটি ভক্ত সবসময় জানতে আগ্রহী থাকেন যে, এই বয়সেও কীভাবে তিনি এতটা লাবণ্যময়ী ও ফিট থাকেন। সম্প্রতি জানা গেছে, মঞ্চে ওঠার আগে শাকিরা অত্যন্ত সহজ কিন্তু বৈজ্ঞানিক ও কার্যকরী একটি রুটিনের মাধ্যমে তার ত্বক ও শরীর প্রস্তুত করেন, যা তাকে দীর্ঘক্ষণ হাই-ভোল্টেজ পারফর্ম করার পরেও সতেজ ও উজ্জ্বল দেখাতে সাহায্য করে। আর সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের তারকা হওয়া সত্ত্বেও এই রূপচর্চার বেশির ভাগ কাজ শাকিরা নিজের হাতেই করতে পছন্দ করেন

রেড লাইট থেরাপি এবং লিম্ফ্যাটিক ড্রেনেজ: শাকিরার নিজস্ব স্কিন কেয়ার

পপ তারকা শাকিরার পেছনে সবসময় একটি বিশাল গ্ল্যাম টিম বা রূপটান বিশেষজ্ঞ দল থাকলেও, তিনি তার ত্বকের প্রাথমিক যত্নের শুরুর কাজগুলো একদম একা ও নিজের ঘরে করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। মঞ্চে মেকআপ নেওয়ার আগে তার প্রথম ও প্রধান ধাপের মধ্যে রয়েছে ত্বকের প্রদাহ ও ক্লান্তি কমাতে একটি আধুনিক ‘রেড লাইট থেরাপি’ (Red Light Therapy) ডিভাইস ব্যবহার করা। এটিকে মূলত ত্বকের ভেতরের কোষ সতেজ করার এবং প্রদাহ কমানোর জন্য এক ধরণের ঘরোয়া লেজার ট্রিটমেন্ট বলা চলে। বিষয়টি তিনি নিজেই তার একটি অফিসিয়াল টিকটক ভিডিওতে ভক্তদের উদ্দেশ্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন এবং দেখান কীভাবে মুখের ত্বকে এই চমৎকার ওয়্যারলেস গ্যাজেটটি ব্যবহার করতে হয়

রেড লাইট থেরাপির ঠিক পর পরই শাকিরা তার ত্বকের ‘লিম্ফ্যাটিক ড্রেনেজ’ (Lymphatic Drainage) প্রক্রিয়ার দিকে মনোযোগ দেন, যার জন্য তিনি এশীয় ঐতিহ্যের একটি ফেশিয়াল ‘গুয়া শা’ (Gua Sha) টুল ব্যবহার করেন। এই বিশেষ প্রাচীন ম্যাসাজ কৌশলটি তার মুখের অতিরিক্ত ফোলা ভাব দ্রুত কমাতে এবং ত্বকের নিচে জমে থাকা অতিরিক্ত তরল বের করে দিয়ে ফেসকাটিং বা মুখের অবয়বকে আরও শার্প ও আকর্ষণীয় করতে সাহায্য করে। শাকিরা ব্যক্তিগত জীবনে বরাবরই একজন দক্ষ ‘মাল্টিটাস্কার’ বা একই সাথে একাধিক কাজে পারদর্শী নারী। তাই কনসার্টের ঠিক আগে যখন তিনি তার কণ্ঠের সুর ঠিক করতে ‘ভোকাল ওয়ার্ম-আপ’ করেন, ঠিক সেই সময়েই হাতের গুয়া শা টুলটি ত্বকে ব্যবহার করতে থাকেন, যার ফলে কম সময়ে দুটো কাজই চলে সমানতালে

মেকআপ সেটিং, হেয়ারস্টাইল ও শাকিরার পছন্দের কসমেটিকস

ত্বকের গভীর যত্ন ও আর্দ্রতা নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর শাকিরা সরাসরি মূল মেকআপের ধাপে চলে যান। হাই-ডেফিনিশন স্টেজ লাইটের নিচেও নিজের রূপ ধরে রাখতে তার পছন্দের তালিকায় নির্দিষ্ট কিছু কসমেটিকস পণ্য রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

  • ফাউন্ডেশন: ত্বকে একটি অত্যন্ত মসৃণ, নিখুঁত এবং একদম স্বাভাবিক বা ন্যাচারাল ফিনিশিং পাওয়ার জন্য তিনি বিশেষ ফাউন্ডেশন ব্যবহার করেন।
  • আইশ্যাডো: মঞ্চের তীব্র আলো এবং ক্যামেরার ফ্ল্যাশের নিচে নিজের চোখ দুটিকে আরও আকর্ষণীয় ও বড় ফুটিয়ে তোলার জন্য গ্লিটারি আইশ্যাডো ব্যবহার করেন।
  • লিপস্টিক: একটি বোল্ড, আকর্ষণীয় অথচ সাবলীল লুক ধরে রাখতে তিনি ঠোঁটে মানানসই লিপস্টিক লাগান।
  • সেটিং স্প্রে: ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাম এবং নাচের পরেও মেকআপ যাতে গলে না যায়, তার জন্য সবকিছু দীর্ঘক্ষণ সেট করে রাখার জন্য হাই-কোয়ালিটি সেটিং স্প্রে ব্যবহার করেন।

সবকিছু সেট করার পর শাকিরা শেষ ছোঁয়া হিসেবে নিজের ব্র্যান্ডের সুগন্ধি বা পারফিউম স্প্রে করে নেন। কারণ পপ দেবীর মতো দেখতে লাগলে মঞ্চে চারপাশ জুড়ে চমৎকার সুগন্ধ ছড়ানোটাও তার পারফরম্যান্সেরই অংশ। অপরদিকে, তার মেকআপের এই পুরো সময় জুড়ে তার ব্যক্তিগত হেয়ারস্টাইলিস্ট শাকিরার বিশ্বখ্যাত ও সিগনেচার ঢেউখেলানো (Wavy) সোনালী চুলের নিখুঁত যত্ন নেন। এই পুরো সাজগোজের বিহাইন্ড-দ্য-সিনস (BTS) বা পর্দার পেছনের ভিডিও শাকিরা তার পুরোনো একটি ভিডিওর মাধ্যমেও ভক্তদের সাথে শেয়ার করেছিলেন

দীর্ঘ ট্যুর ও পারফরম্যান্সের জন্য যেভাবে ফিট থাকেন পপ তারকা

মঞ্চে টানা দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে একটানা লাইভ গান গাওয়া এবং একই সাথে উচ্চ শক্তির নাচ বা বেলি ড্যান্স পরিবেশন করা সাধারণ কোনো বিষয় নয়। শরীরকে এই স্তরে ফিট রাখতে শাকিরা কেবল সাধারণ নাচের মহড়ার ওপর নির্ভর করেন না। তার ফিটনেস রুটিনে শরীরের পেশির শক্তি, স্ট্যামিনা এবং নমনীয়তা (Flexibility) বহুগুণ বাড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট কয়েকটি ভারী ও বৈজ্ঞানিক জিম ব্যায়াম অন্তর্ভুক্ত থাকে, যা তার ট্যুর পারফরম্যান্সের জন্য অপরিহার্য। তার নিয়মিত ফিটনেস তালিকায় রয়েছে—

১. ডেড লিফট (Dead Lift): এটি শাকিরার পিঠ, কোর পেশি, গ্লুটস এবং পা শক্তিশালী করার পাশাপাশি পারফর্ম করার সময় মঞ্চে তার শরীরের ভঙ্গি বা পসচার (Posture) উন্নত করতে সাহায্য করে

২. হিপ থ্রাস্টস (Hip Thrusts): নাচের সময় শরীরের নিচের অংশের শক্তি ও ভারসাম্য বাড়ানোর জন্য গ্লুটস, ঊরু এবং লোয়ার কোরকে লক্ষ্য করে শাকিরা নিয়মিত এই ভারী ব্যায়ামটি করেন

এসবের পাশাপাশি শাকিরা তার আপার বডি বা হাতের শক্তি বজায় রাখার জন্য নিয়মিত আপার-বডি এক্সারসাইজ বা হাতের ব্যায়ামও করেন। তবে কেবল কঠোর পরিশ্রম বা কসরত করাই শেষ কথা নয়, শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়াও সমান জরুরি। তাই এই পপ তারকা যখনই অনুশীলনের ফাঁকে সামান্য সময় পান, অন্তত ১০ মিনিটের জন্য নিজে নিজেই বডি ম্যাসাজ করে নেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, তীব্র প্রশিক্ষণের মতোই পেশির পুনরুদ্ধার বা রিকভারিও পারফরম্যান্সের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ

মঞ্চে ওঠার ঠিক আগের চূড়ান্ত মুহূর্ত

সাজগোজ এবং ফিটনেস সেশনের পর মঞ্চের ব্যাকস্টেজে ও গ্রিনরুমে প্রবেশ করার পর শাকিরার প্রস্তুতির শেষ এবং চূড়ান্ত ধাপগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • ভোকাল ওয়ার্ম-আপ: নিজের কণ্ঠস্বরকে গানের জন্য সেরা ও সুরেলা অবস্থায় রাখার জন্য ঘড়ির কাঁটা ধরে ঠিক ১০ মিনিটের একটি ভোকাল ওয়ার্ম-আপ সেশন সম্পন্ন করেন।
  • লাস্ট লুক: মঞ্চে প্রথম কদম ফেলার ঠিক আগ মুহূর্তে ড্রেস, মেকআপ এবং চুল সবকিছু শতভাগ ঠিকঠাক আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আয়নায় শেষবারের মতো নিজেকে একবার দেখে নেন পপ কুইন।

বিশ্বকাপের মঞ্চে শাকিরার এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তন এবং তার লাইফস্টাইল আবারও প্রমাণ করেছে যে, দীর্ঘ ট্যুরের সময় নিজেকে সুন্দর দেখানো এবং ভেতর থেকে ফিট অনুভব করাটা কেবল কোনো দামি গ্ল্যাম স্কোয়াড কিংবা কোটি টাকার বিউটি ট্রিটমেন্টের ওপর নির্ভর করে না। এটি মূলত নিয়মানুবর্তিতা, ধারাবাহিকতা, ত্বকের উপযুক্ত যত্ন এবং একটি শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল ফিটনেস রুটিনের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। শাকিরার এই ব্যস্ত রুটিন থেকে যদি বিশ্ববাসীর একটি বিষয় শেখার থাকে, তবে তা হলো— শত ব্যস্ততার মাঝেও নিজের যত্ন নেওয়া এবং একই সঙ্গে একাধিক কাজ বা মাল্টিটাস্কিং দক্ষতার মাধ্যমে জীবনের আসল পরিবর্তন আনা সম্ভব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *