আবারও টাইব্রেকারে হতাশা নেদারল্যান্ডস, শেষ ষোলোতে মরক্কো

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নিষ্ঠুর ও রোমাঞ্চকর ভাগ্যপরীক্ষা টাইব্রেকার। আর এই টাইব্রেকার যেন নেদারল্যান্ডস ফুটবল দলের জন্য এক চিরস্থায়ী অভিশাপ। আবারও সেই পেনাল্টি শুটআউটের নার্ভ ধরে রাখতে না পেরে কপাল পুড়ল ডাচদের। মঙ্গলবার (৩০ জুন) এস্তাদিও মন্তেরেতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ রাউন্ড অব ৩২–এর ম্যাচে নেদারল্যান্ডসকে টাইব্রেকারে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ১৬-র টিকিট নিশ্চিত করেছে মরক্কো। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১-১ গোলে ড্র থাকার পর পেনাল্টি মিসের মহড়ায় ডাচদের বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে উল্লাসে মেতে ওঠে গত আসরের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কো। অন্যদিকে, টানা দ্বিতীয়বারের মতো টাইব্রেকার ট্র্যাজেডির শিকার হয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হলো ডাচদের।

ম্যাচের গতিপ্রকৃতি ও মরক্কোর আধিপত্য

ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের ফুটবলারদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা লক্ষ্য করা যায়। বল দখল এবং আক্রমণে মরক্কো স্পষ্ট আধিপত্য বজায় রাখলেও ডাচদের জমাট রক্ষণভাগ ভাঙতে তাদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। ম্যাচের পুরো সময় জুড়ে প্রায় ৭০ শতাংশ বল পজেশন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল মরক্কো। তারা একের পর এক আক্রমণ শানিয়ে ডাচ রক্ষণকে তটস্থ করে তোলে। পুরো ম্যাচে মরক্কো মোট ১২টি শট নেয়, যার মধ্যে ৬টিই ছিল অন-টার্গেট বা গোল অভিমুখে। অপরদিকে, কিছুটা রক্ষণাত্মক কৌশলে খেলে কাউন্টার অ্যাটাকের ওপর ভরসা করা নেদারল্যান্ডস ৭টি শটের মধ্যে মাত্র ৩টি শট লক্ষ্যে রাখতে সক্ষম হয়। ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিট পর্যন্ত মরক্কোর আক্রমণভাগের ফুটবলারদের গোলমুখে ফিনিশিংয়ের অভাব এবং ডাচ গোলরক্ষকের অসাধারণ কিছু সেভের কারণে ম্যাচটি রোমাঞ্চকর দিকে মোড় নেয়।

কোডি গাকপোর গোল এবং এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি

ম্যাচে অবশ্য প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধে ডাচরাই প্রথম গোলের দেখা পেয়েছিল। ম্যাচের ৭২ মিনিটে লিভারপুলের তারকা উইঙ্গার কোডি গাকপো দারুণ এক গোল করে নেদারল্যান্ডসকে লিড এনে দেন। সামারাভিলের একটি চোখ ধাঁধানো পাস ধরে গতিময় দৌড়ে মরক্কোর ডি-বক্সে ঢুকে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করে বল জালে পাঠান গাকপো। তবে গোল করার পরপরই এক অদ্ভুত ও আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয় মাঠে। আনন্দের বদলে মাঠের মধ্যেই কান্নায় ভেঙে পড়েন এই তারকা।

এই ম্যাচের ঠিক আগমুহূর্তে কোডি গাকপো তার মাতৃগর্ভে থাকা অনাগত সন্তানকে হারিয়েছেন। এক চরম পারিবারিক ও মানসিক বিপর্যয় মাথায় নিয়ে তিনি দেশের জন্য মাঠে নেমেছিলেন। গোল করার পর আকাশের দিকে হাত তুলে কান্নাভেজা চোখে তিনি তার সেই অনাগত সন্তানকে স্মরণ করেন। এই আবেগঘন মুহূর্তে নেদারল্যান্ডসের পুরো দল তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা জানায়, যা স্টেডিয়ামের হাজারো দর্শকের চোখ ভিজিয়ে দেয়।

নেদারল্যান্ডস যখন এই এক গোলের লিড নিয়ে জয়ের দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই নির্ধারিত সময়ের একদম শেষ মিনিটে (৯০ মিনিটে) অবিশ্বাস্য এক আক্রমণ থেকে সমতায় ফেরে মরক্কো। কর্নার থেকে উড়ে আসা চমৎকার এক ক্রসে লাফিয়ে উঠে দর্শনীয় হেডের মাধ্যমে বল ডাচদের জালে পাঠান মরক্কোর ডিফেন্ডার ইসা দিওপ। এই গোলের ফলে ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটেও কোনো দল গোল করতে না পারায় ম্যাচের ভাগ্য গড়ায় পেনাল্টি শুটআউটে।

টাইব্রেকারের স্নায়ুযুদ্ধ এবং পেনাল্টি মিসের মহড়া

টাইব্রেকারে শুরু হয় চরম নাটকীয়তা। পেনাল্টি মিসের এমন মহড়া সাম্প্রতিক সময়ে ফুটবল বিশ্বে খুব কমই দেখা গেছে। একের পর এক শট কেউ মারলেন পোস্টের বাইরে, কেউবা উড়িয়ে দিলেন বারের উপর দিয়ে। ডাচদের হয়ে টাইব্রেকারের প্রথম শটটি নেন তোন কোপমেইনার্স। মরক্কোর তারকা গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনো সঠিক দিকে ঝাঁপিয়েও বলের গতি রোধ করতে পারেননি, ফলে ডাচরা এগিয়ে যায়। তবে মরক্কোর পক্ষে প্রথম শট নিতে এসে সম্পূর্ণ লক্ষ্যভ্রষ্ট শট মেরে বসেন নিল এল আয়নাওয়ি।

এরপর ডাচদের পক্ষে দ্বিতীয় শট নিতে আসেন জাস্টিন ক্লুইভার্ট, কিন্তু তার শটটি মিস হয়ে যায়। মরক্কোর সোফিয়ান রাহিমির নেওয়া পরবর্তী শটটি ডাচ গোলরক্ষক ভেরব্রুখেন রুখে দিতে চাইলেও বল তার পায়ে লেগে অলৌকিকভাবে জালে জড়িয়ে যায়, যার ফলে শুটআউটে সমতা ফেরে। এরপর দুই দলের পক্ষে যথাক্রমে ডাচ স্ট্রাইকার ওট ভেঘর্স্ট এবং মরক্কোর তালিবি অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় বল জালে জড়াতে সক্ষম হন। তবে চতুর্থ শটের সময় আবারও স্নায়ুর চাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে; নেদারল্যান্ডসের কুইন্টিন টিম্বার এবং মরক্কোর বিশ্বখ্যাত ডিফেন্ডার আশরাফ হাকিমি—দুজনই নিজেদের শট মিস করেন।

চূড়ান্ত ও পঞ্চম শটের ওপর যখন পুরো ম্যাচের ভাগ্য ঝুলছিল, তখন নেদারল্যান্ডসের পক্ষে সামারাভিল এসে শট মিস করে ডাচ সমর্থকদের স্তব্ধ করে দেন। ডাচদের এই চরম ব্যর্থতার পর মরক্কোর ইসমাইল সাইবারি আর কোনো ভুল করেননি। অত্যন্ত নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে দলকে ৩-২ ব্যবধানের ঐতিহাসিক জয় এনে দেন তিনি।

টাইব্রেকার আতঙ্ক ও ডাচদের ইতিহাস

এই হারের মাধ্যমে নেদারল্যান্ডসের ফুটবল ইতিহাসে টাইব্রেকারের দুঃস্বপ্ন আরও দীর্ঘায়িত হলো। এটি ছিল টানা দ্বিতীয়বারের মতো টাইব্রেকারে হেরে ডাচদের বিশ্বকাপ থেকে বিদায়। এর আগে গত আসরের কোয়ার্টার ফাইনালেও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে টাইব্রেকারে হেরেই বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও এই আর্জেন্টিনার কাছেই পেনাল্টি শুটআউটে কপাল পুড়েছিল নেদারল্যান্ডসের। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১০ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ের গোলে হারের পর থেকে, ডাচরা বিশ্বকাপের মঞ্চে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে কোনো ম্যাচ হারেনি। অথচ প্রতিবারই টাইব্রেকার নামক লটারিতে এসে তাদের বিদায় নিতে হচ্ছে।

পরবর্তী মিশন: শেষ ষোলোতে প্রতিপক্ষ কানাডা

রাউন্ড অব ৩২-এর এই ঐতিহাসিক জয়ের পর গত আসরের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কো এখন আরও বড় স্বপ্নের দিকে তাকাচ্ছে। শেষ ষোলোর বা প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালের লড়াইয়ে মরক্কো প্রতিপক্ষ হিসেবে পাচ্ছে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম সহ-আয়োজক দেশ কানাডাকে। আগামী শনিবার (৪ জুলাই) হিউস্টন স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে এই দুই দল। মরক্কোর এই জয় দলটিকে মানসিকভাবে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে নিয়ে গেছে, যা কানাডার বিরুদ্ধে তাদের বাড়তি সুবিধা দেবে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *