বিশ্বকাপে টানা ৭ ম্যাচে গোল, নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়লেন মেসি

ফুটবলের মহাবিস্ময় লিওনেল মেসি যেন প্রতি ম্যাচেই ফুটবলকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছেন। এর আগে বিশ্বকাপের মঞ্চে টানা ৬ ম্যাচে গোল করে ফ্রান্সের কিংবদন্তি জাস্ট ফন্টেইন (১৯৫৮) এবং ব্রাজিলের জেয়ারজিনহোর (১৯৭০) সাথে যৌথভাবে শীর্ষে ছিলেন মেসি। তবে আজ রোববার (২৮ জুন, ২০২৬) জর্ডানের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে সেই রেকর্ড ভেঙে এককভাবে টানা ৭ ম্যাচে গোলের নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়লেন তিনি। চলতি বিশ্বকাপে এটি মেসির ষষ্ঠ গোল এবং সব মিলিয়ে বৈশ্বিক এই টুর্নামেন্টে এটি তার ১৯তম গোল।

মেসিকে বেঞ্চে রেখে আর্জেন্টিনার প্রথমার্ধের দাপট

যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস স্টেডিয়ামে ‘জে’ গ্রুপের ম্যাচে জর্ডানের মুখোমুখি হয়েছিল লিওনেল স্কালোনির দল। বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টায় শুরু হওয়া এই হাইভোল্টেজ ম্যাচের প্রথমার্ধে সামান্য হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি বা পেশির সমস্যার কারণে অধিনায়ক মেসিকে বেঞ্চে রেখে একাদশ সাজান কোচ স্কালোনি। তবে মহাতারকাকে বিশ্রামে রেখেও প্রথমার্ধে দাপুটে ফুটবল খেলে দুই গোলের স্বস্তির লিড নিয়ে বিরতিতে যায় বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।

ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল ও আক্রমণে একচেটিয়া আধিপত্য দেখায় আলবিসেলেস্তেরা। ম্যাচের ১৯ মিনিটে ফ্রি-কিক থেকে দুর্দান্ত এক বাঁকানো শটে গোল উৎসবের সূচনা করেন মিডফিল্ডার জিওভানি লো সেলসো। মেসির অনুপস্থিতিতে তার বাঁ পায়ের নিখুঁত শট জর্ডানের গোলরক্ষককে পুরোপুরি পরাস্ত করলে ১-০ গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।

এরপর ম্যাচের ৩০ মিনিটে কর্নার থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণে জর্ডানের আল-রাশদান বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার মার্কোস সেনেসির মুখে বুট মারেন। ভিএআর (VAR) পর্যালোচনা করে রেফারি আর্জেন্টিনার পক্ষে পেনাল্টির বাঁশি বাজান। ৩১ মিনিটে স্পটকিক থেকে কোনো ভুল করেননি দলের নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকার লাওতারো মার্তিনেজ। জর্ডানের গোলরক্ষককে ভুল পথে পাঠিয়ে নিচের বাঁ কোণে বল জড়িয়ে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোলের দেখা পান এই স্ট্রাইকার। তার গোলে ব্যবধান দাঁড়ায় ২-০। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে নিকোলাস ওতামেন্দির একটি হেড অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট না হলে ব্যবধান আরও বাড়তে পারত।

জর্ডানের প্রতিরোধ ও মেসির মাঠে আগমন

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল আর্জেন্টিনার হাতেই। ৪৮ মিনিটে লো সেলসো আরও একটি গোল করলেও অফসাইডের কারণে রেফারি সেটি বাতিল করে দেন। তবে ম্যাচের ৫৫ মিনিটে হঠাৎই কাউন্টার অ্যাটাক থেকে ঘুরে দাঁড়ায় জর্ডান। ডান প্রান্ত দিয়ে এহসান হাদ্দাদের নিচু ক্রসে বদলি খেলোয়াড় মুসা আল-তামারি সহজ টোকায় বল জালে পাঠিয়ে ব্যবধান ২-১ করেন। এই গোলের মধ্য দিয়েই গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচ জাল অক্ষত রাখা আর্জেন্টিনার দুর্ভেদ্য রক্ষণভাগ এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো গোল হজম করে।

জর্ডানের এই গোলের ঠিক পরেই, ম্যাচের ৬০ মিনিটে গ্যালারির আকাশছোঁয়া গর্জনের মধ্যে মাঠে নামানো হয় লিওনেল মেসিকে। বেঞ্চ থেকে উঠে সবুজ গালিচায় পা রাখার পর থেকেই ম্যাচের চিত্র বদলে যায়।

৮০ মিনিটে মেসির সেই ট্রেডমার্ক জাদুকরি ফ্রি-কিক

ম্যাচ যখন ২-১ ব্যবধানে টানটান উত্তেজনায় রূপ নিচ্ছিল, ঠিক তখনই ম্যাচের ৮০ মিনিটে ডি-বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রি-কিক পায় আর্জেন্টিনা। বলের সামনে দাঁড়ান ফুটবল ঈশ্বর। জর্ডানের তৈরি করা মানবপ্রাচীরকে বোকা বানিয়ে নিজের চিরচেনা ‘ট্রেডমার্ক’ বাঁ পায়ের বাঁকানো ফ্রি-কিকে চোখধাঁধানো এক গোল করেন লিওনেল মেসি। গোলরক্ষকের কেবল চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। এই ঐতিহাসিক গোলের পর ম্যাচ পুরোপুরি আর্জেন্টিনার নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে জয়ের সুবাস নিয়ে মাঠ ছাড়ে স্কালোনির শিষ্যরা।

এক নজরে বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির ঐতিহাসিক মাইলফলক:

  • টানা গোল: ৭ ম্যাচে (বিশ্বকাপের ইতিহাসে এককভাবে প্রথম ও একমাত্র খেলোয়াড়)
  • চলতি আসরে গোল: ৬টি (গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষে)
  • বিশ্বকাপে সর্বমোট গোল: ১৯টি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *