কেন অন্য পেশা ছেড়ে অটোরিকশা চালানোর দিকে ঝুঁকছেন মানুষজন?

সহজ সুযোগ পাওয়ায় তৈরি পোশাকের মতো প্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরাও এখন চাকরি ছেড়ে যোগ দিচ্ছেন অটোরিকশা চালানোয়। সেই সঙ্গে কৃষিসহ অন্যান্য পেশা ছেড়েও অনেকে আসছেন অটো চালাতে।

এমনই একজন জুয়েল রানা। সম্প্রতি গার্মেন্টসের চাকরি ছেড়ে তিনি অটোরিকশা চালাচ্ছেন। জুয়েল রানা জানান, ‘আমি ২০ বছর গার্মেন্টসে চাকরি করেছি। ২০ বছর চাকরি করার পর আমার কর্মস্থল গার্মেন্টসটি বন্ধ হয়ে যায়। সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রায় তিন মাস বসে ছিলাম। কোনো কাজকর্ম পাচ্ছিলাম না। এরপর আমি অটোরিকশা চালানোর পেশায় আসি।’

জুয়েল রানার মতো একই অবস্থা মোহাম্মদ সুমনের। পোশাক কারখানায় কাজ হারিয়ে এখন চালান ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।

তিনি বলেন, ‘গার্মেন্টসে চাকরি করার সময় আমার বেতন ছিল সাড়ে আট হাজার টাকা। পরে চাকরি ছেড়ে ব্যবসা শুরু করি। প্রথম দিকে কিছুদিন ভালো চলেছিল। প্রায় দুই বছর ব্যবসা ভালো চলার পর আবার মন্দা দেখা দেয়।’

আসলাম মোল্লা ছেড়েছেন কৃষিকাজ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে দিনমজুরের কাজ না পেয়ে এ পেশায় এসেছেন আব্দুর রহিম।

আব্দুর রহিম বলেন, ‘এক লাখ টাকা দিয়ে এক খণ্ড জমি উঠিয়ে নিলে পরের খণ্ডটিতে লাভ থাকবে। কিন্তু আমাদের পুঁজি নেই। পুঁজি নেই বলেই আমরা ঢাকা শহরে এসে রিকশা চালাচ্ছি। গার্মেন্টসে যে বেতন পেতাম, তা দিয়ে আমার সংসার চলত না। বেতন দিয়ে তারা ঘোরাঘুরি করে। সেই চাকরি ছেড়ে আমি অন্য কাজে এসেছিলাম। এরপর মাটি কাটা ও মাটির কাজ শুরু করি। কিন্তু সেই কাজও একসময় বন্ধ হয়ে গেছে।’

বলা হয়ে থাকে দেশে বর্তমানে ৬০ লাখের মতো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা আছে। কোনো নিয়মনীতি না থাকায় দ্রুত বাড়ছে এই খাত। চালকদের মাসিক আয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। অন্য পেশা থেকে অটোচালকের কাজ করায় শ্রমবাজারে তৈরি হয়েছে ভারসাম্যহীনতা।

এ বিষয়ে নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের সভাপতি ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জানান, ‘কৃষি খাতে এখন আমাদের যেভাবে শ্রমিক প্রয়োজন, সেভাবে শ্রমিক পাওয়া যায় না। বিশেষ করে চারা রোপণের মৌসুমে এবং ফসল কাটার মৌসুমে প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি এলাকাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবীদের দিয়েও এসব কাজ করাতে হয়।’

অটোরিকশার ওপর যে নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে তা হঠাৎ বন্ধ হলে বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে। এতে তৈরি হতে পারে সামাজিক অসন্তোষ। তাই বিকল্প কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব বিশেষজ্ঞদের।

তবে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘রাষ্ট্র বিকল্প ব্যবস্থা দিতে পারছে না বলেই মানুষ এই পেশা গ্রহণ করেছে। সুতরাং, রাষ্ট্রকে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই এই পেশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তা না হলে এটি চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর্যায়ে পৌঁছাবে এবং সমাজে আরও বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে।’

এসব ঝুঁকিপূর্ণ যানকে লাইসেন্সের আওতায় এনে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিকল্প পেশায় যুক্ত হওয়ার শর্তে স্বল্প সময়ের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালুর পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা।

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় যারা এ ধরনের যান চালানো ছেড়ে দেবেন বা আর এ পেশায় থাকবেন না বলে নিশ্চয়তা দেবেন, তাদের জন্য সে অনুযায়ী একটি কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। অন্তত তিন মাসের জন্য তাদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় কোনো সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। তাহলে তাঁরা কিছুটা স্বস্তি বোধ করবেন এবং এই সময়ের মধ্যে বিকল্প কোনো কর্মসংস্থানে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন।’

অটোরিকশা চালকদের মধ্যে যারা আগের পেশায় ফিরে যেতে চান, তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *