দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার কারণে চলমান এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা স্থগিত রাখা, খাতার মূল্যায়নপদ্ধতি সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ নানা দাবিতে গতকাল বুধবারও (১৫ জুলাই ২০২৬) দিনভর নজিরবিহীন আন্দোলনে ফেটে পড়ে সাধারণ এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। তাদের পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল দুপুরের পর থেকেই রাজধানীর নীলক্ষেত, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, মিরপুর ও উত্তরাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সড়ক অবরোধ করা হয়। পরবর্তীতে বিকেল থেকে শিক্ষার্থীদের ‘লং মার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সরকারি শিক্ষা ভবন ও সচিবালয় এলাকা ঘেরাও করে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়।
দিনভর শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল থাকলেও, বিকেল পৌনে ৫টার দিকে শিক্ষা ভবনের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা কিছুটা নমনীয় হয়ে মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি সাময়িকভাবে স্থগিত করে নতুন ‘৬ দফা দাবি’ উথাপন করে। তবে দাবি আদায়ের সুনির্দিষ্ট আশ্বাস না পাওয়ায় সন্ধ্যা ৬টার দিকে তারা পুনরায় মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিয়ে চারপাশের রাস্তা সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলে। এতে রাজধানীজুড়ে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী যানজটের সৃষ্টি হয়, যার ফলে চরম চরম দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ মানুষ।
শিক্ষার্থীদের ঘোষিত নতুন ৬ দফা দাবি
বিকেলে শিক্ষা ভবনের সামনের বিক্ষোভে পরীক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে যে ৬ দফা দাবি তুলে ধরা হয়, সেগুলো হলো:
১. পুনঃপরীক্ষার সুযোগ: দেশের বর্তমান দুর্যোগপূর্ণ ও বন্যাকবলিত পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় যেসব শিক্ষার্থী আশানুরূপ পরীক্ষা দিতে পারেনি, তারা যদি পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিতে চায় তবে তাদের সেই সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। ২. সর্বোচ্চ নম্বর গণনা: যেসব পরীক্ষার্থী একই বিষয়ের পরীক্ষা পুনরায় দেবে, তাদের ক্ষেত্রে পূর্বের পরীক্ষা ও পুনঃপরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে যেটিতে সর্বোচ্চ নম্বর থাকবে, সেটিই চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে গণ্য করতে হবে। ৩. ভুল প্রশ্নের পূর্ণ নম্বর: এবারের এইচএসসি প্রশ্নপত্রে থাকা সকল ভুল প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীদের ঢালাওভাবে পূর্ণ নম্বর প্রদান করতে হবে। ৪. মানসিক স্থিতিশীলতার সময়: চলমান অস্থিতিশীল ও দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে স্থিতিশীল হওয়ার জন্য যৌক্তিক সময় দিতে হবে এবং এরপরই পুনরায় স্থগিত পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। ৫. প্রশ্নপত্রের ধরনে নম্বর মূল্যায়ন: পূর্বঘোষণা বা আগাম নোটিশ ছাড়া প্রশ্নপত্রের ধরনে যে আকস্মিক পরিবর্তন আনা হয়েছে (যা আগের বছরের তুলনায় শিক্ষার্থীদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল), তা বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে নম্বর মূল্যায়ন করতে হবে। ৬. শিক্ষকদের সচেতন আচরণ: পরীক্ষা চলাকালে ‘সচেতন গার্ড’-এর নামে কিছু কক্ষ পরিদর্শক শিক্ষকের অযাচিত কঠোর ও বিভ্রান্তিকর আচরণ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে, যাতে পরীক্ষার্থীরা কক্ষে ভীত বা মানসিক চাপে না পড়ে।
রাজপথে দাবি আদায়ের ঘোষণা, আলোচনা বর্জন
জানা গেছে, বিকেলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনার জন্য রওনা হয়েছিল। তবে তারা সচিবালয়ে প্রবেশ না করে পথ থেকেই আকস্মিকভাবে ফিরে আসে। ফিরে এসে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা জানান, তারা কোনো বদ্ধ ঘরে আলোচনা চান না, রাজপথেই আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করা হবে।
এর আগে বিকেল ৪টার দিকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে শিক্ষা ভবনের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ তাদের ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দেয়। তারও আগে দুপুরে পরীক্ষার্থীরা রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে প্রায় আধা ঘণ্টা অবস্থান করে সড়ক অবরোধ করে রাখে। দুপুরে শিক্ষার্থীদের এই ঘেরাও কর্মসূচির প্রেক্ষিতে সচিবালয়ের ১ নম্বর, ২ নম্বর ও ৫ নম্বর গেট ঘুরে দেখা যায়, সাধারণ সময়ের তুলনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা নজিরবিহীনভাবে জোরদার করা হয়েছে। প্রতিটি গেটে অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন এবং প্রবেশকারীদের পরিচয়পত্র কঠোরভাবে তল্লাশি করা হয়।
রাজধানীজুড়ে তীব্র যানজট, ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ
গতকাল দুপুর দেড়টা থেকে একযোগে নীলক্ষেত মোড়, সায়েন্স ল্যাব মোড়, মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও উত্তরা বিএনএস সেন্টারসহ রাজধানীর বিভিন্ন ব্যস্ততম এলাকায় শিক্ষার্থীরা দলে দলে বিভক্ত হয়ে সড়ক অবরোধ করে। এর ফলে দুপুরের পর থেকে পুরো ঢাকায় সব ধরনের যানবাহন চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে।
সন্ধ্যায় নীলক্ষেত মোড়ে দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকা নজরুল ইসলাম নামের এক বেসরকারি চাকুরিজীবী ক্ষোভ প্রকাশ করে দৈনিক রিপোর্টার বিডি-কে বলেন, “সকাল থেকে এখন পর্যন্ত পুরো ঢাকা শহর যানজটে অচল হয়ে আছে। একেকবার একেক মোড়ে রাস্তা ব্লক করা হচ্ছে। এটা কেমন কথা? ছাত্রদের দাবি থাকতে পারে, কিন্তু এভাবে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে দেশ চলতে পারে না।”
সমস্যার সমাধান হয়েছে, দাবি ডিএমপির
এদিকে বিকেলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মির্জা তারেক আহমেদ বেগ উত্তরা এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার দাবি করে বলেন, “সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে এবং পরীক্ষার্থীরা নতুন করে আর রাস্তায় নামবে না। আমরা আন্দোলনরত পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছি। তাদের আজকের পরীক্ষা অত্যন্ত ভালো হয়েছে। তারা উত্তরা এলাকায় যে রাস্তা ব্লক করেছিল, আমাদের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে তা নিজেরাই ছেড়ে দিয়ে ঘরে ফিরে গেছে।” তবে সন্ধ্যার পর শাহবাগে শিক্ষার্থীদের পুনরায় অবস্থান নেওয়া রাজধানীর সার্বিক পরিস্থিতিকে আবারও থমথমে করে তুলেছে।
