শেষ মুহূর্তের নাটকে ইংল্যান্ডকে বিদায়, আর্জেন্টিনার প্রশংসায় ব্রিটিশ গণমাধ্যম

দীর্ঘ ৬০ বছর পর ১৯৬৬ সালের পর আবারও বিশ্বকাপ জয়ের যে স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ইংল্যান্ড, তার অপেক্ষা এবারও ফুরালো না। ২০২৬ বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচের ৮৪ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তের চরম নাটকীয়তায় ২-১ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিয়েছে থ্রি লায়ন্সরা। নকআউটের টানা তৃতীয় ম্যাচে অবিশ্বাস্য ও জাদুকরী কামব্যাকের (Comeback) গল্প লিখে ফাইনালে পা রাখল লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে, তীরে এসে তরী ডোবার এই নিদারুণ যন্ত্রণায় বুক ভেঙেছে ইংলিশদের। এই ঐতিহাসিক পরাজয় নিয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করলেও মহাতারকা লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনার লড়াইকে প্রশংসায় ভাসাচ্ছে খোদ ব্রিটিশ গণমাধ্যমগুলো।

ম্যাচের ৮৪ মিনিট পর্যন্ত জয়ের সুবাস পাচ্ছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু ৮৫ মিনিটে আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজের এক বুলেট গতির দূরপাল্লার শট এবং যোগ করা সময়ে (৯০+২ মিনিট) লাউতারো মার্টিনেজের অনবদ্য এক হেডে জয় নিশ্চিত হয় আলবিসেলেস্তেদের। আর এই দুটি রূপকথার গোলেই জাদুকরী অ্যাসিস্ট (Assist) করেন ফুটবল ঈশ্বর লিওনেল মেসি।

ব্রিটিশ গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনামে শুধুই হতাশা ও মেসির স্তুতি

ম্যাচ শেষ হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থাগুলো এই হারের তীব্র যন্ত্রণা ও আর্জেন্টিনার বীরত্বগাথা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে:

  • দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian): তাদের প্রধান শিরোনামে লিখেছে, “শেষ মুহূর্তের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে ইংল্যান্ডের হৃদয় ভেঙে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল আর্জেন্টিনা।”
  • দ্য সান (The Sun): শব্দের চমৎকার খেলায় লিওনেল মেসির নাম ও পর্তুগিজ শব্দ ব্যবহার করে শিরোনাম করেছে— “অ্যানাদার মেসি কুইলোম্বো” (Another Messi Quilombo)। ‘কুইলোম্বো’ শব্দের মাধ্যমে মূলত মেসির ফুটবলীয় নৈপুণ্যে প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ ও রণকৌশল কীভাবে ‘বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে নিমজ্জিত’ হয়েছে, তা ইঙ্গিত করা হয়েছে। তারা আরও যোগ করে, “যোগ করা সময়ে লাউতারো মার্টিনেজের জয়সূচক গোলে থ্রি লায়ন্সের বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙে দিল আর্জেন্টিনা।”
  • বিবিসি (BBC): ব্রিটিশ এই প্রধান সংবাদ সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, “আর্জেন্টিনার কাছে হেরে সেমিফাইনাল থেকেই যন্ত্রণাদায়ক বিদায় ইংল্যান্ডের।” প্রতিবেদনের প্রচ্ছদে ম্যাচ শেষে পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে হ্যারি কেইনকে প্রতিপক্ষ অধিনায়ক লিওনেল মেসির সঙ্গে বুকে বুক মিলিয়ে আলিঙ্গন করতে দেখা যায়।
  • স্কাই স্পোর্টস (Sky Sports): নাটকীয় মুহূর্তের সময় উল্লেখ করে তারা লিখেছে, “৮৫ মিনিট, ৯০+২ মিনিট! শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডের হৃদয় ভেঙে বিশ্বকাপের স্বপ্নে ইতি টানলো।” তাদের প্রধান প্রচ্ছদে জায়গা পান ম্যাচের অন্যতম গোলদাতা ও নায়ক এনজো ফার্নান্দেজ।
  • দ্য মিরর (The Mirror): ম্যাচ শেষে জুড বেলিংহ্যামের হতাশায় চোখ বন্ধ করে হাঁটু মুড়ে মাঠে বসে পড়ার বড় ছবি দিয়ে এক শব্দে ব্যানার শিরোনাম লিখেছে— শ্যাটারড (চূর্ণ-বিচূর্ণ)”। লিড হারিয়ে ইংল্যান্ডের স্বপ্নের অশ্রুসিক্ত ইতি।
  • ডেইলি এক্সপ্রেস (Daily Express): প্রথম পাতা জুড়ে মাটিতে শুয়ে থাকা হতাশাগ্রস্ত কেইনের ছবি দিয়ে শিরোনাম করেছে— “নিদারুণ যন্ত্রণায় আমাদের অপেক্ষা বেড়েই চলেছে।”
  • ডেইলি স্টার (Daily Star): তারা লিখেছে— “কেইনড বাই মেসি” (Keined by Messi)। অর্থাৎ মেসি-বাহিনীর কৌশলের কাছে পুরো ম্যাচজুড়ে বোতলবন্দী ও অচল ছিলেন ইংলিশ অধিনায়ক হ্যারি কেইন।

গ্যালারিতে বেকহ্যামের অশ্রু, মাঠে কেইনের কান্না

বৃটিশ ট্যাবলয়েড পত্রিকা ডেইলি মেইল (Daily Mail) তাদের বিশেষ প্রতিবেদনে ডালাসের গ্যালারি ও মাঠের ভেতরের আবেগঘন চিত্র তুলে ধরে লিখেছে, “আর্জেন্টিকার কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে পুরো ইংল্যান্ড। গ্যালারিতে বসে থাকা কিংবদন্তি ডেভিড বেকহ্যামকে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও চোখ মুছতে দেখা গেছে, আর মাঠের ভেতরে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তরুণ খেলোয়াড়রা। থ্রি লায়ন্সের ১৯৬৬ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দিয়েছে মাত্র দুটি গোল।” তাদের প্রধান ছবির ক্যাপশন ছিল ‘আটলান্টায় হৃদয়ভঙ্গ’।

এ ছাড়া ডেইলি মেইল তাদের প্রতিবেদনে আর্জেন্টিনার সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার লিয়েন্দ্রো পারেদেসের একটি আচরণের তীব্র সমালোচনা করে তাঁকে ‘করুণ’ বলে আখ্যা দিয়েছে। ম্যাচ চলাকালে ফিফার নতুন নিয়ম ভঙ্গের ওজুহাত তুলে ফরাসি বা আন্তর্জাতিক রেফারির কাছে ইংলিশ অধিনায়ক হ্যারি কেইনকে লাল কার্ড দেখানোর জন্য পারেদেস যে জোর দাবি তুলেছিলেন, তা ফুটবলীয় স্পিরিটের পরিপন্থী বলে দাবি করেছে পত্রিকাটি।

মাঠের বাইরে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের রাজনৈতিক উত্তেজনা

ম্যাচ শুরুর আগে কোচ লিওনেল স্কালোনি রাজনৈতিক ইতিহাসকে মাঠের বাইরে রাখার ঘোষণা দিলেও, ম্যাচ শেষে মাঠের চিত্র ছিল ভিন্ন। রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর পর আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার জিওভানি লো সেলসো গ্যালারির সামনে ‘দ্য ফকল্যান্ডস ইজ আর্জেন্টাইন’ (ফকল্যান্ডস আর্জেন্টিনার) এবং ‘মালভিনাস আমাদের’ লেখা একটি বিশেষ রাজনৈতিক ব্যানার ও পতাকা প্রদর্শন করে উদযাপন করেন। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ডস যুদ্ধের এই স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে উদযাপনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ মিডিয়া। দ্য সানের ভাষায়— এটি আর্জেন্টাইনদের চরম ঔদ্ধত্য। ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করার পর বিতর্কিত পতাকা নিয়ে উদযাপন করায় ব্রিটিশ ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।”

এই নাটকীয় জয়ের মাধ্যমে আগামী রোববার রাতে নিউইর্য়ক নিউজার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠেয় ২০২৬ বিশ্বকাপের মেগা ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। ফুটবল বিশ্ব এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে আরও একটি ধ্রুপদী ফাইনাল দেখার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *