নারী ও কন্যাশিশুর সুরক্ষায় ইউএন উইমেনের আরও জোরালো সহযোগিতা চাইল বাংলাদেশ

চলমান বৈশ্বিক সংঘাত, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, পণ্য সরবরাহ চেইনে নজিরবিহীন বিঘ্ন এবং তীব্র জ্বালানি সংকটের ফলে তৈরি হওয়া বহুমাত্রিক চাপের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নারী ও কন্যাশিশুদের সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে জাতিসংঘ নারী সংস্থার (UN Women) আরও জোরালো, সমন্বিত ও কার্যকর সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই ২০২৬) নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন থেকে পাঠানো এক বিশেষ প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব এবং ইউএন উইমেনের উপনির্বাহী পরিচালক নিয়ারাডজাই গুম্বোনজভান্ডার (Nyaradzayi Gumbonzvanda) সাথে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও মানবিক পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও নারীদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের তাগিদ

বৈঠকে ড. তিতুমীর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ সম্পূর্ণ মানবিক ও আন্তর্জাতিক মহানুভবতার পরিচয় দিয়ে বর্তমানে ১২ লাখের বেশি বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিককে দীর্ঘমেয়াদে আশ্রয় দিয়ে আসছে। বিপুল সংখ্যক এই শরণার্থীর অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি, প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং সার্বিক নিরাপত্তার ওপর একটি নজিরবিহীন ও উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি আন্তর্জাতিক আইন মেনে রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদভাবে তাদের নিজস্ব মাতৃভূমি মিয়ানমারে স্থায়ী প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান। একই সাথে প্রত্যাবাসন-পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে রোহিঙ্গা নারী ও কন্যাশিশুরা যাতে মিয়ানমারে ফিরে সম্পূর্ণ নিরাপদ, স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করতে পারে, টেকসই জীবিকা নির্বাহের পর্যাপ্ত সুযোগ পায় এবং তাদের মৌলিক অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত হয়—সে লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে ইউএন উইমেনের আরও সক্রিয়, কার্যকর ও দৃশ্যমান ভূমিকা প্রত্যাশা করেন।

সংকুচিত ফিসকাল স্পেস ও ফ্যামিলি কার্ডের উদ্ভাবন

উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর চলমান আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সংকটের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “বৈশ্বিক সংকটের বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে, যার ফলে সরকারের উন্নয়নমূলক ‘ফিসকাল স্পেস’ (Fiscal Space) ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (IFIs) আরোপিত অত্যন্ত কঠোর শর্ত ও নীতিমালার কারণে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক অনুদান এবং সহজ শর্তের ঋণপ্রাপ্তি (Soft Loans) সংকুচিত হয়ে পড়ছে, যা অনেক দেশকে নতুন ঋণচাপের মুখোমুখি করছে।”

এই বৈরী অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেই তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ নারী ও কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা, সামাজিক ক্ষমতায়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও বেগবান করতে ইউএন উইমেনের কার্যকর ও সম্প্রসারিত আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের নারী-কেন্দ্রিক বিভিন্ন বৈপ্লবিক উন্নয়ন উদ্যোগের কথা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরে ড. তিতুমীর বলেন, “পরিবারের নারীপ্রধানের নামে বিশেষ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ (Family Card) চালু, মেয়েদের স্নাতকোত্তর (Masters) পর্যায় পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, নারীদের প্রজনন ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সফল সম্প্রসারণ এবং সর্বজনীন জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার যুগান্তকারী উদ্যোগসমূহ মাঠপর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়ন ও জাতীয় অর্থনীতিতে তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণকে আরও ত্বরান্বিত করবে।”

বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা

জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব ও ইউএন উইমেনের উপনির্বাহী পরিচালক নিয়ারাডজাই গুম্বোনজভান্ডা বৈশ্বিক বিভিন্ন সূচকে নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ও দৃশ্যমান অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের ফ্যামিলি কার্ড উদ্যোগটিকে একটি অত্যন্ত উদ্ভাবনী, সময়োপযোগী এবং শতভাগ নারী-কেন্দ্রিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি হিসেবে অবিহিত করেন, যা অন্যান্য দেশের জন্য উদাহরণ হতে পারে।

ডিপ্লোম্যাটিক সোর্সে নিজের কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফরের বাস্তব ও আবেগঘন অভিজ্ঞতা তুলে ধরে গুম্বোনজভান্ডা বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের মানবিক উদারতার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা, লিঙ্গসমতা (Gender Equality) নিশ্চিতকরণ, নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, সামাজিক সুরক্ষার উন্নয়ন এবং জাতিসংঘে ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ (Women, Peace and Security) এজেন্ডা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক অংশীদার হিসেবে ইউএন উইমেনের প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা আগামী দিনগুলোতে আরও জোরদার ও সম্প্রসারিত করার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *