জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বর্তমান নির্বাচিত সরকারের কতিপয় মন্ত্রীর দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য, সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈধতা এবং গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করার তীব্র সমালোচনা করে হুঙ্কার ছেড়েছেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে শপথ করে বলেছেন, “আল্লাহর কসম, জীবন দেব কিন্তু ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক রক্তের অর্জন কোনোভাবেই হারিয়ে যেতে দেব না।” অতীতে বারবার সাধারণ মানুষ, ছাত্র ও যুবসমাজ রক্ত দিয়ে অর্জন এনে দিলেও কিছু লুটেরা তা ছিনিয়ে নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন এবং বলেন, আজও ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মহান ফসলকে নস্যাৎ করার গভীর চক্রান্ত ও চেষ্টা চলছে।
আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই ২০২৬) দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলে অবস্থিত আইডিবি (IDB) মিলনায়তনে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের উদ্যোগে শহীদ আবু সাঈদসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের অত্যন্ত সাবলীল সঞ্চালনায় এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল।
‘২০২৪ না হলে তারেক রহমানও প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না’
জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেন, “আজ দেশে যে নতুন সংসদ ও সরকার গঠিত হয়েছে, দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষ একবাক্যে স্বীকার করেন যে এটি ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের সরাসরি ফসল। অথচ ক্ষমতার মসনদে বসে কেউ কেউ এখন বলতে চান, ২০২৪-এর আন্দোলন তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, আগের দীর্ঘ রাজনৈতিক অংশটাই নাকি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা তো কখনো আগের ত্যাগকে অস্বীকার করিনি। ফ্যাসিবাদের সেই অন্ধকার সময়েই তো আমরা আমাদের ১১ জন শীর্ষ জাতীয় নেতাকে হারিয়েছি, শত শত সহকর্মীকে হারিয়েছি। অসংখ্য মানুষ বছরের পর বছর কারাগারে কাটিয়েছেন, চাকরি হারিয়েছেন, নিজেদের ঘরবাড়িতে ঘুমাতে পারেননি। আমরা সেই সর্বোচ্চ ত্যাগকে সর্বদা শ্রদ্ধা করি। কিন্তু এটাও চিরন্তন সত্য যে, ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লব না হলে আজ আমি এখানে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে বক্তৃতা দিতে পারতাম না, জামায়াত থেকে কেউ সংসদ সদস্য হতে পারতেন না; একইভাবে বিএনপি নেতা তারেক রহমানও আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না।”
সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “কিছু মন্ত্রী সংসদের ভেতরে এবং টেলিভিশনের টকশোতে অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিভ্রান্তিকর কথা বলছেন। আমরা যখন এসব জনগুরুত্বপূর্ণ ও আদর্শিক বিষয় জাতীয় সংসদে উত্থাপন করি, তখন স্পিকার ও সরকারি দল থেকে বলা হয় এগুলো সংসদের বাইরের বিষয়। অথচ আমাদের ও আমাদের দলকে রাজনৈতিকভাবে আঘাত করতে গেলে তারা নির্দ্বিধায় আধা শতাব্দী অর্থাৎ ৫০ বছর আগের পুরোনো রাজনৈতিক ঘটনাও টেনে আনেন।”
তিনি একটি গ্রামীণ প্রবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “চিংড়ি মাছ লাফ দিলে সবসময় পেছনের দিকেই যায়, সামনে যাওয়ার রাস্তা খুঁজে পায় না। একটি বীর জাতি যদি সবসময় পেছনের সংকটের দিকেই তাকিয়ে থাকে, তাহলে সামনে এগোবে কীভাবে? আমরা সবসময় বলেছি, আসুন অতীত ভুলে সামনে তাকাই এবং ২০২৪-এর তরুণদের যে বৈষম্যহীন অঙ্গীকার, তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করি।”
তরুণদের বৈষম্যহীন সমাজ ও নৈতিকতার প্রশ্ন
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাইয়ের বীর তরুণরা একটি বৈষম্যহীন ও সাম্যের সমাজ চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল দেশের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হোক, দুর্নীতি চিরতরে দূর হোক, সাধারণ ব্যবসায়ীরা যেন চাঁদাবাজির কবল থেকে মুক্তি পায় এবং দেশের পবিত্র আদালতে মানুষ যেন প্রকৃত ন্যায়বিচার পায়। তারা রাষ্ট্রের কাছে কোনো ভিক্ষা বা দয়া চায়নি, তারা তাদের মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত কাজের সুযোগ চেয়েছিল। কিন্তু আমরা আজ সরকারের বড় বড় বুলি ও কথা শুনলেও মাঠপর্যায়ে কাজের বেলায় তার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন বা বাস্তবায়ন দেখছি না।
জাতীয় সংসদের বর্তমান প্রেক্ষাপট টেনে তিনি বলেন, “দেশের মানুষ সংসদ অধিবেশন দেখেন, কারণ আপনারা এটিকে মজলুম মানুষের অধিকার আদায়ের সংসদ মনে করেন। সেখানে মজলুম মানুষের প্রকৃত প্রতিনিধিরা জনগণের সুখ-দুঃখ নিয়ে কী বলেন, তা জানার গভীর আগ্রহ দেশের আপামর জনতার আছে। জনগণই শেষ পর্যন্ত নিজেদের বিবেক দিয়ে সবকিছুর চুলচেরা মূল্যায়ন করবেন।”
গণভোটের রায় নিয়ে ‘ভাওতাবাজি’ ও সংবিধান সংশোধন কমিটি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় দাবির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে জামায়াত আমির বলেন, আন্দোলনের সবচেয়ে বড় দাবি ছিল ফ্যাসিবাদ যেন আর কোনোদিন বাংলাদেশে রূপ পাল্টে ফিরে আসতে না পারে। আর এজন্যই আমূল রাষ্ট্র সংস্কার এবং একটি সম্পূর্ণ নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রয়োজন ছিল। অতীতের পচা ও কলঙ্কিত সুবিধাবাদী রাজনীতিকে বিদায় দিয়ে একটি স্বচ্ছ ও নতুন দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার বিকল্প ছিল না।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এখন সরকারের কেউ কেউ বলছেন গণভোট নাকি সংবিধানে নেই। আবার কেউ বলছেন, গণভোটের চারটি প্রশ্ন এত জটিল ছিল যে তা বুঝতেই নাকি চার ঘণ্টা লাগে! তাহলে দেশের মানুষ কীভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিল? আমি পরিষ্কারভাবে বলি, এই চারটি প্রশ্ন তো ভোটের অনেক আগেই সব গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার ও ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। তাহলে কি আপনারা বলতে চান, বুদ্ধি ও মগজ শুধু আপনাদেরই আছে, দেশের ১৮ কোটি সাধারণ মানুষের নেই? এটা পুরো জাতিকে চরমভাবে অপমান করার শামিল। আমি শফিকুর রহমান মূর্খ হতে পারি, কিন্তু আমার জাতি কখনো মূর্খ নয়।”
তিনি আরও বলেন, “চারটি প্রশ্নই যদি মানুষ বুঝতে না পারে, তবে আপনারা যে ৩১টি প্রশ্ন তৈরি করেছেন, তা মানুষ কীভাবে বুঝবে? এগুলো সব গোঁজামিল, ধোঁকাবাজি ও রাজনৈতিক ভাওতাবাজি। ইতোমধ্যে সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলেছেন—ভোটটা হয়ে যাক, তাই সবকিছু আগে কৌশলগত কারণে মেনে নিয়েছিলাম! আরেকজন বলেছেন—টোল মওকুফের কথা নাকি বলা হয়েছিল স্রেফ ভোট পাওয়ার জন্য! রাজনীতিবিদরা যদি এভাবে প্রকাশ্যে রাষ্ট্রের ও বীর শহীদদের রক্তের সাথে এবং জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেন, তবে দেশের মানুষ যাবে কোথায়? যারা দেশ চালাবেন, দেশের পবিত্র আইন তৈরি করবেন, তাদের ন্যূনতম নৈতিক মানদণ্ড ও সততা থাকা উচিত।”
বিরোধীদলীয় নেতা ক্ষোভের সাথে জানান, নির্বাচনের আগে সব দল গণভোটের পক্ষে ছিল এবং দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে গণরায় দিয়েছেন। এখন সরকার বলছে তারা ৫১ শতাংশ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করেছে, তাই ৭০ শতাংশ মানুষের দেওয়া সেই ঐতিহাসিক গণরায় মানা হবে না। শফিকুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, “আমি সাধারণ গণিতে জানতে চাই, ৫১ বড়, নাকি ৭০ বড়? আপনারা এই ৫১ শতাংশ ভোট কীভাবে পেয়েছেন, সেই নির্বাচন ও সাড়ে তিন ঘণ্টা ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করে পর্দার আড়ালে কী করা হয়েছে, তার বিতর্ক ইতিহাসে থেকেই যাবে। সময়মতো ইতিহাস সবকিছুরই চূড়ান্ত বিচার করবে।”
সংসদে গঠিত বর্তমান সংবিধান সংশোধন কমিটি নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলে জামায়াত আমির বলেন, “এখন আমাদেরও বলা হচ্ছে, আপনারাও আসুন, এই জনরায় অগ্রাহ্যের মিছিলে শরিক হোন। সংসদে আমাদের সংবিধান শেখানো হয়। আমি আইন প্রণেতাদের কাছে জানতে চাই, ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি’ নামে কোনো বিশেষ কমিটির অস্তিত্ব আমাদের মূল সংবিধানের কোথাও আছে কি? যদি সংবিধানে না থাকে, তবে এটি কেন গঠন করা হলো? এটি আসলে জুলাইয়ের চেতনা ও গণভোটের গণরায়কে মানুষের মন থেকে জোরপূর্বক ভুলিয়ে দেওয়ার একটি অপচেষ্টা মাত্র। আমরা এর পরিষ্কার প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছি। জনগণের রায়কে আপনারা অপমান করতে চাইলে করুন, জনগণই উপযুক্ত সময়ে এর বিচার করবে। জামায়াতে ইসলামী সর্বদা জনগণের সাথে আছে, রায়ের পক্ষে আছে এবং এই আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে। ইনশাআল্লাহ ৭০ শতাংশ মানুষের গণরায় বৃথা যাবে না, তা এই মাটিতে বাস্তবায়িত হবেই।”
ভারতের ‘লাল কার্ড’ ও জনগণের অন্তরের আশ্রয়
প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান অত্যন্ত কঠোর ও কূটনৈতিক ভাষায় বলেন, “আজকে অনেকেই প্রতিবেশী দেশ নিয়ে নানা আক্ষেপ প্রকাশ করছেন। আমরাই এ দেশের একমাত্র রাজনৈতিক দল, যাদেরকে তারা (ভারত) নীতিগত কারণে পছন্দ করে না। তারা বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলকে দিল্লির মাটিতে রাজকীয় আমন্ত্রণ জানিয়েছে, শুধু বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জন্য রেখেছে ‘লাল কার্ড’। কিন্তু আমরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিতে চাই, আমরা সেই লাল কার্ডের বিন্দুমাত্র পরোয়া করি না। ভারতের মাটিতে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়ার কোনো চিন্তাও আমরা কখনো মনে স্থান দিই না। এই স্বাধীন বাংলাদেশই আমাদের একমাত্র প্রিয় মাতৃভূমি। আমাদের আশ্রয়ের শ্রেষ্ঠ এবং নিরাপদ জায়গা হলো বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের ভালোবাসার পবিত্র অন্তর।”
