আফগানিস্তানে জাতিসংঘ মিশনের প্রধান হলেন বাংলাদেশি কূটনীতিক রাবাব ফাতিমা

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কূটনীতির আরও একটি ঐতিহাসিক ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় সূচিত হলো। আফগানিস্তানে জাতিসংঘের সহায়তা মিশনের (ইউএনএএমএ) নতুন প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশের প্রথিতযশা ও অভিজ্ঞ নারী কূটনীতিক রাবাব ফাতিমা। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গতকাল বুধবার (১৫ জুলাই ২০২৬) এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর কূটনৈতিক পদের জন্য তাঁর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।

পেশাদার কূটনীতিক রাবাব ফাতিমা ইতিপূর্বে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতা ও সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশের পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দায়িত্ব কৃতিত্বের সাথে সম্পন্ন করেছেন।

৩০ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতা ও উচ্চপদস্থ দায়িত্বের খতিয়ান

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্রের দপ্তর থেকে গতকাল বুধবার প্রকাশিত এক বিশেষ বিবৃতিতে বলা হয়, “বাংলাদেশি কূটনীতিক রাবাব ফাতিমার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সিভিল সার্ভিসে দায়িত্ব পালনের ৩০ বছরেরও বেশি সময়ের সুদীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ঝুলিতে রয়েছে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কূটনীতি, কৌশলগত নীতিনির্ধারণ, আন্তর্জাতিক অ্যাডভোকেসি এবং উন্নয়নমূলক কর্মসূচি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অনন্য দক্ষতা।”

বর্তমানে রাবাব ফাতিমা জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত—স্বল্পোন্নত দেশ, স্থলবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ ও ক্ষুদ্র দ্বীপপুঞ্জের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জাতিসংঘের উচ্চ প্রতিনিধির (Under-Secretary-General) মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর এই নতুন নিয়োগ বৈশ্বিক সংকটে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দক্ষতার ওপর বিশ্বসম্প্রদায়ের গভীর আস্থারই বহিঃপ্রকাশ।

জর্জেট গ্যানিওনের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন রাবাব ফাতিমা

আফগানিস্তানে জাতিসংঘের এই বিশেষ সহায়তা মিশনের শীর্ষ পদে রাবাব ফাতিমা মূলত কানাডীয় কূটনীতিক জর্জেট গ্যানিওনের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন। জর্জেট গ্যানিওনের পূর্বে ইউএনএএমএ-এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। এখন থেকে মিশনের সার্বিক কার্যক্রমের মূল নেতৃত্ব থাকবে বাংলাদেশি কূটনীতিক রাবাব ফাতিমার হাতে।

চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে আফগানিস্তানে ইউএনএএমএ-এর ভূমিকা

আফগানিস্তানে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইউনাইটেড নেশনস অ্যাসিস্ট্যান্স মিশন ইন আফগানিস্তান’ (UNAMA)। পরবর্তীতে ২০২১ সালে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় কট্টরপন্থী তালিবান গোষ্ঠী ফিরে আসার পর থেকে দেশটিতে ইউএনএএমএ-এর গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের সফল সমন্বয়, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংলাপ এগিয়ে নেওয়া এবং সাধারণ মানুষের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে এই মিশন অত্যন্ত অভিভাবকত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

যদিও বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইউএনএএমএ-এর লক্ষ্য, কার্যপদ্ধতি ও তালিবানদের সাথে যোগাযোগের কিছু কৌশল নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গভীর আপত্তি রয়েছে, তা সত্ত্বেও মিশনটির গুরুত্ব বিবেচনা করে গত জুন মাসে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইউএনএএমএ-এর কার্যকালের মেয়াদ বা ‘ম্যান্ডেট’ আরও এক বছরের জন্য নবায়ন করেছে। এই অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাবাব ফাতিমার মতো একজন দক্ষ ও প্রজ্ঞাবান বাংলাদেশি কূটনীতিকের মিশন প্রধান হওয়াকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *