জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের মরদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার তথ্য মিলেছে: চিফ প্রসিকিউটর

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ ও লাশ গুমের চেষ্টার এক গা শিউরে ওঠা চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। প্রাথমিক তদন্তের তথ্য উল্লেখ করে তিনি জানিয়েছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত অনেকের মরদেহ ঢাকার একটি হাসপাতাল থেকে রাতের আঁধারে পাশের একটি নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের তৎকালীন কর্তৃপক্ষ এবং জড়িত প্রতিটি ব্যক্তিকে সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করে কঠোর বিচারের আওতায় আনা হবে।

আজ বুধবার (১৫ জুলাই ২০২৬) দুপুরে রাজধানীর রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান–সংলগ্ন জুলাই শহীদদের বিশেষ গণকবর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এই বিস্ফোরক তথ্য জানান।

রায়েরবাজার গণকবরে ১১৪ মরদেহ, শনাক্ত হয়েছে ৮ জন

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রায়েরবাজারের এই গণকবরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ১১৪টি অজ্ঞাত ও বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করা হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ডিএনএ টেস্ট ও বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় মাত্র আটজন জুলাই শহীদের সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। বাকি অন্যান্য শহীদদের সঠিক পরিচয় নিখুঁতভাবে শনাক্ত করার আইনি ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের তদন্ত দল মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালিয়ে জানতে পেরেছে, ঢাকার একটি বড় হাসপাতাল থেকে আন্দোলন চলাকালীন নিহত অনেক ছাত্র-জনতার মরদেহ স্রেফ গুম করার উদ্দেশ্যে পাশের একটি নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমরা ইতিমধ্যেই সেই হাসপাতালের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ এবং লাশ গুমের এই নির্মম প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করার জন্য নিবিড়ভাবে কাজ করছি। তদন্ত শেষ হওয়া মাত্রই তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে যেসব মরদেহের তথ্য পাওয়া গেছে, বৈজ্ঞানিক ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সেগুলোর প্রকৃত পরিচয় ও সংখ্যা শনাক্ত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মরদেহ শনাক্ত ও জাতিসংঘের তথ্য

সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে আমিনুল ইসলাম আরও জানান, জাতিসংঘের (UN) আনুষ্ঠানিক ও নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দেশজুড়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। ট্রাইব্যুনালের তদন্তের আইনি অংশ হিসেবেই তদন্ত সংস্থা এই গণকবরগুলো পরিদর্শন করছে। এখন পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও দাপ্তরিকভাবে ৮৩৪ জন জুলাই শহীদের মরদেহ সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

তিনি স্পষ্ট করেন যে, নিখোঁজ ও পরিচয়হীন বাকি শহীদদের পরিচয় বের করতে তদন্ত দল পর্যায়ক্রমে ঢাকার জুরাইন, মাতুয়াইল এবং ঢাকার নিকটবর্তী নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের গণকবরগুলোও সরেজমিনে পরিদর্শন করবে। কবর থেকে সংগৃহীত ডিএনএ (DNA) পরীক্ষা এবং আধুনিক ফরেনসিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিহত প্রতিটি ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করার পর তাদের সম্মানজনক তালিকা ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে। জুলাইয়ের গণহত্যার কোনো অপরাধীই রেহাই পাবে না বলে পুনরায় হুঁশিয়ারি দেন চিফ প্রসিকিউটর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *