‘মানুষ যতটা খারাপ বলছে, আর্জেন্টিনা ততটা খারাপ খেলছে না’ সেমিফাইনালের আগে স্কালোনি

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে শিরোপা নির্ধারণের মহালড়াইয়ে নামার আগে সমীকরণ এখন একদম পরিষ্কার। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচকে হিসাবের বাইরে রাখলে টুর্নামেন্টে ম্যাচ বাকি আর মাত্র দুটি, আর বিশ্বজয়ের ট্রফির দৌড়ে টিকে আছে কেবল তিনটি দল। যার মধ্যে অন্যতম শীর্ষ দাবিদার বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। কাতার বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি জয়ী আলবিসেলেস্তেরা এবার তাদের মুকুট ধরে রাখতে পারবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে; তবে নকআউটের একের পর এক কঠিন বৈতরণী পার হয়ে সেমিফাইনালের এই চূড়ান্ত মঞ্চে পা রাখাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।

আজ রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা। তবে এই হাইভোল্টেজ ম্যাচের আগে দলটির নান্দনিকতা ও খেলার মান নিয়ে খোদ সমর্থকদের একাংশের মনে কিছুটা অতৃপ্তি দানা বেঁধেছে। অনেকেরই মতে, মাঠে চ্যাম্পিয়নসুলভ সেরা পারফরম্যান্স দিতে পারছে না আর্জেন্টিনা। তবে সেমিফাইনালের বিগ ম্যাচের আগে ড্রেসিংরুমের এই ‘খারাপ খেলা’র গুঞ্জন ও নেতিবাচক সমালোচনাকে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন আর্জেন্টিনার মাস্টারমাইন্ড কোচ লিওনেল স্কালোনি। আটলান্টায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি কড়া ভাষায় জানিয়েছেন, মানুষ বা সমালোচকেরা বাইরে থেকে যেমনটা ভাবছে, তাঁর দল মাঠে তার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ও ভালো ফুটবল খেলছে।

গ্রুপ পর্বের দাপট বনাম নকআউটের স্নায়ুযুদ্ধ

এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপ ‘জে’ (Group J)–তে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডানের মতো দলগুলোকে অনায়াসে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই নকআউটে পা রেখেছিল আর্জেন্টিনা। তবে নকআউটের পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। কেপ ভার্দে, মিসর ও সুইজারল্যান্ডের মতো লড়াকু দলগুলোকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করতে আর্জেন্টাইনদের ঘাম ঝরাতে হয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, শেষ বত্রিশে কেপ ভার্দে এবং কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে জয় পেতে আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময় (Extra Time) পর্যন্ত ম্যাচ টানতে হয়েছিল। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছিল শেষ ষোলোর ম্যাচে, যেখানে মিসরের বিপক্ষে ম্যাচের ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০ ব্যবধানে অবিশ্বাস্যভাবে পিছিয়ে ছিল বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় ম্যাচ জিতলেও, দলের এই ছন্দহীনতা নিয়েই মূলত তৈরি হয়েছে সমর্থকদের অতৃপ্তি।

সমালোচকদের এই ধারণার জবাবে কোচ স্কালোনি বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, “বাইরে মানুষ যতটা খারাপ বলছে, দল মাঠে ততটা খারাপ খেলছে না। বিশ্বকাপের এই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য আমরা নিশ্চয়ই মাঠে কৌশলগতভাবে সঠিক কিছু করেছি।” দলে সেই চেনা ধার নেই—এমন মন্তব্যের পিঠে তিনি যোগ করেন, “আমি আমার খেলোয়াড়দের প্রতি কৃতজ্ঞ। এই দলটাই আর্জেন্টিনাকে তিনটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা এনে দিয়েছে এবং এখন আরেকটি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তুলেছে। আমরা আমাদের মূল লক্ষ্য থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে আছি এবং ফাইনালে পৌঁছাতে আজ রাতে নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দেব।”

উল্লেখ্য, আর্জেন্টিনা সর্বশেষ চার বিশ্বকাপের মধ্যে এ নিয়ে তৃতীয়বার সেমিফাইনাল খেলছে, যার মধ্যে ২০২২ সালে এসেছে পরম আরাধ্য বিশ্বজয়। পাশাপাশি ২০২১ ও ২০২৪ সালের মহাদেশীয় শিরোপা কোপা আমেরিকাতেও চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তারা।

‘নান্দনিকতা নয়, জয়টাই শেষ কথা’

দলের রণকৌশল ও খেলার ধরন নিয়ে স্কালোনি তাঁর স্বভাবসুলভ বাস্তববাদী দর্শন তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমি যেভাবে চেয়েছিলাম, দল ঠিক সেভাবে নিখুঁতভাবে খেলছে কি না, তা নিয়ে এই মুহূর্তে ভাবার কোনো অবকাশ নেই। কারণ, আজ থেকে দেড় মাস আগে যদি যেকোনো উপায়ে সেমিফাইনালে ওঠার সুযোগ থাকত, আমি চোখ বন্ধ করে তা লুফে নিতাম। খেলার ধরন বা নান্দনিকতা এখন আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়, ফলাফলটাই আসল। দল নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই।”

ফুটবল মাঠে আসবে না ফকল্যান্ডের রাজনৈতিক ইতিহাস

আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের দ্বৈরথ মানেই ফুটবলীয় লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠের বাইরের ভূরাজনৈতিক উত্তাপ। স্বাভাবিকভাবেই সংবাদ সম্মেলনে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের (Falklands War) ঐতিহাসিক ও দুঃখজনক সশস্ত্র বিরোধের প্রসঙ্গটি চলে আসে।

তবে এই রাজনৈতিক আবহকে মাঠের সবুজ ঘাসে প্রবেশ করতে দিতে নারাজ আর্জেন্টাইন বস। স্কালোনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের পুরো দল রাজনৈতিক ইতিহাসকে এক পাশে সরিয়ে রেখে কেবল খেলার মাঠেই শতভাগ মনোযোগ ধরে রাখবে। তিনি বলেন, “বাস্তবতা হলো এটি একটি ফুটবল ম্যাচ মাত্র। সেটি (ফকল্যান্ড যুদ্ধ) আমাদের ইতিহাসের একটি অত্যন্ত দুঃখজনক অধ্যায় ছিল। কিন্তু অতীত নিয়ে এখন আমাদের কিছু করার নেই, এটাই বাস্তবতা।”

আজ রাত ১টায় আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ফাইনালের টিকিট কাটার মহালড়াইয়ে মুখোমুখি হবে ফুটবল বিশ্বের এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। সারা বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন এই ধ্রুপদী মহারণ উপভোগ করার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *