কিশোরগঞ্জের ভৈরবে টাকা ধার না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে এক নারী গৃহশিক্ষিকাকে দা দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে নৃশংসভাবে জখম করার এক বর্বরোচিত ঘটনা ঘটেছে। গত সোমবার (১৩ জুলাই ২০২৬) সকালে ভৈরব উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের পানাউল্লাহচর এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত ওই শিক্ষিকার নাম সিঁথি সীমিতা (২৫)। তিনি বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এই নৃশংস হামলার ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত গৃহবধূ প্রিয়া বেগমকে (৩০) অবরুদ্ধ করে পুলিশে সোপর্দ করেছে স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা। এ ঘটনায় আহত শিক্ষিকার শ্বশুর মো. শিশু মিয়া বাদী হয়ে প্রিয়া বেগমকে একমাত্র আসামি করে ভৈরব থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেছেন। ওই মামলায় পুলিশ প্রিয়া বেগমকে গ্রেফতার দেখিয়ে বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে।
ভুলবশত ফেলে যাওয়া ছাতা আনতে গিয়েই রক্তক্ষয়ী হামলা
আহত শিক্ষিকা সিঁথি সীমিতা উপজেলার পানাউল্লারচর গ্রামের মো. মুরাদ মিয়ার স্ত্রী। তিনি স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি অবসর সময়ে বাড়িতে গিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট টিউটর হিসেবে পড়াতেন। অন্যদিকে, গ্রেফতার হওয়া অভিযুক্ত প্রিয়া বেগম একই গ্রামের পার্শ্ববর্তী বাড়ির বায়েজিদ মিয়ার স্ত্রী।
স্থানীয় সূত্র ও মামলা সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতো গত সোমবার সকালেও শিক্ষিকা সিঁথি সীমিতা বায়েজিদ মিয়ার বাসায় তাঁর কন্যাসন্তানকে প্রাইভেট পড়াতে যান। পড়ানো শেষ করে নিজের বাড়িতে ফেরার সময় সীমিতা ভুলবশত তাঁর ব্যবহৃত ছাতাটি শিক্ষার্থীর বাসায় ফেলে আসেন। কিছুক্ষণ পর ছাতাটি নিতে তিনি পুনরায় ওই বাসায় প্রবেশ করলে কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই শিক্ষার্থীর মা প্রিয়া বেগম ধারালো দা নিয়ে তাঁর ওপর চড়াও হন এবং এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করেন। এ সময় শিক্ষিকার বুকফাটা আর্তচিৎকারে প্রতিবেশীরা দ্রুত ছুটে এসে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে এবং প্রিয়া বেগমকে ঘরে আটকে রেখে পুলিশে খবর দেয়।
নেপথ্যে ২০ হাজার টাকা ধার না পাওয়ার ক্ষোভ
আহত শিক্ষিকার পরিবারের দাবি, এই বর্বরোচিত হামলার পেছনে পূর্বপরিকল্পনা ও ক্ষোভ কাজ করেছে। কয়েক দিন আগে অভিযুক্ত প্রিয়া বেগম শিক্ষিকা সিঁথি সীমিতার কাছে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ২০ হাজার টাকা ধার চেয়েছিলেন। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষিকা সীমিতা সেই টাকা ধার দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এতে সীমিতার ওপর চরম ক্ষুব্ধ হন প্রিয়া বেগম। ধারণা করা হচ্ছে, সেই ক্ষোভ থেকেই পরিকল্পিতভাবে সীমিতা পুনরায় ঘরে প্রবেশ করা মাত্রই এই প্রাণঘাতী হামলা চালানো হয়েছে।
আজ বুধবার (১৫ জুলাই ২০২৬) দুপুরে মামলার বাদী ও আহত শিক্ষিকার শ্বশুর মো. শিশু মিয়ার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত আবেগাপ্লুত কণ্ঠে দৈনিক রিপোর্টার বিডি-কে বলেন, “সামান্য ২০ হাজার টাকা ধার না দেওয়ায় প্রিয়া বেগম এভাবে পরিকল্পিতভাবে আমার পূত্রবধূকে দা দিয়ে কুপিয়ে মাথা, পিঠ ও হাত মারাত্মকভাবে জখম করেছে। ওর অবস্থা ভালো নয়, বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে। আমি এই পৈশাচিক হামলার দৃষ্টান্তমূলক ও সুষ্ঠু বিচার চাই।”
মামলার এজাহারে টাকা ধার চাওয়ার বিষয়টি কেন উল্লেখ করা হয়নি—জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সোমবার ঘটনার পরপরই আমরা রক্তাক্ত সীমিতাকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটোছুটি ও মামলা করার কাজে ব্যস্ত ছিলাম। তখন পুত্রবধূর সঙ্গে কথা বলার মতো অবস্থা ছিল না। পরে হাসপাতালে ওর জ্ঞান ফিরলে ও কথা বললে আমরা টাকা ধার চাওয়ার ও ক্ষোভের বিষয়টি জানতে পারি।”
পুলিশের বক্তব্য ও আইনি প্রক্রিয়া
এ বিষয়ে ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিমন বোস দৈনিক রিপোর্টার বিডি-কে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “শিক্ষিকার ওপর হামলার খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযুক্ত প্রিয়া বেগমকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। পরবর্তীতে আহতের শ্বশুরের দায়ের করা মামলায় তাঁকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে ইতিমধ্যে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আমরা ঘটনার পেছনের মূল কারণ ও টাকা ধারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছি। তদন্ত শেষেই আদালতে দ্রুত অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হবে।” এই বর্বরোচিত ঘটনায় স্থানীয় শিক্ষক সমাজ ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
