শেখ হাসিনা ও ১০ শিল্প গ্রুপের ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ: বিএফআইইউ

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং দেশের প্রভাবশালী ১০টি বৃহৎ শিল্প গ্রুপের দেশে ও বিদেশে থাকা মোট ৭৬ হাজার কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের অবৈধ সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব জব্দ (Freeze) করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) বিশেষ যৌথ তদন্তের পর এই নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

আজ বুধবার (১৫ জুলাই ২০২৬) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত বিএফআইইউর ‘বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ’ অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চাঞ্চল্যকর ও যুগান্তকারী তথ্য নিশ্চিত করেছেন বিএফআইইউ প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন।

৫৭ হাজার কোটি টাকার অভ্যন্তরীণ ও ১৯ হাজার কোটি টাকার বিদেশি সম্পদ জব্দ

সংবাদ সম্মেলনে বিএফআইইউ প্রধান বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে বলেন, “বিএফআইইউ এবং বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ যৌথ তদন্তের আওতায় থাকা এসব ভিআইপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দেশের ভেতরে থাকা ৫৭ হাজার কোটি টাকার সমমূল্যের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ ক্রোক ও জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে দেশের বাইরে পাচার হওয়া আরও ১৯ হাজার কোটি টাকার বিদেশি সম্পদ ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সফলভাবে ফ্রিজ করা সম্ভব হয়েছে।”

তিনি দেশের সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে আরও বলেন, “দেশ থেকে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি ও পাচার হয়ে গেছে, তা আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের টিম দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করছে। সব প্রক্রিয়া ঠিকঠাক থাকলে চলতি ২০২৬ বছরের শেষের দিকে পাচার হওয়া সম্পদ দেশের অর্থনীতিতে ফেরত আনার বিষয়ে জাতিকে একটি বড় ‘সুখবর’ দেওয়া যাবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে আশা করছি।”

রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিষয়

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক তীক্ষ্ণ প্রশ্নের উত্তরে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন বিএফআইইউর কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমরা কোনো রাজনৈতিক দলমত বা ব্যক্তির প্রভাবের দিকে তাকিয়ে কাজ করি না। যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের লেনদেনে ন্যূনতম সন্দেহজনক কোনো কিছু পরিলক্ষিত হলেই আইন অনুযায়ী সাথে সাথে তাদের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয়। এমনকি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালেরও কেউ যদি এমন অবৈধ আর্থিক অনিয়মের সাথে জড়িত হয়ে থাকেন, তবে তদন্ত সাপেক্ষে খুব শীঘ্রই সেটাও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।”

তদন্তের জালে থাকা শেখ হাসিনা পরিবার ও শীর্ষ ১০টি শিল্প গ্রুপ

বিএফআইইউ সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কাল থেকেই মূলত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার এবং দেশের শীর্ষ ১০টি বৃহৎ ব্যবসায়ী ও শিল্প গ্রুপের নজিরবিহীন অবৈধ সম্পদ অর্জন, হাজার হাজার কোটি টাকার কর ফাঁকি (Tax Evasion) এবং বিদেশে অর্থপাচারের (Money Laundering) বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি শক্তিশালী যৌথ তদন্ত দল (Joint Investigation Team) মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করে। তদন্তের আওতায় আসা এবং সম্পদ জব্দ হওয়া শীর্ষ ১০টি আলোচিত শিল্প গ্রুপ হলো:

১. এস আলম গ্রুপ

২. বেক্সিমকো গ্রুপ

৩. নাবিল গ্রুপ

৪. সামিট গ্রুপ

৫. ওরিয়ন গ্রুপ

৬. নাসা গ্রুপ

৭. বসুন্ধরা গ্রুপ

৮. ডা. ইকবালের প্রিমিয়ার গ্রুপ

৯. সিকদার গ্রুপ

১০. সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের মালিকানাধীন আরামিট গ্রুপ।

বিএফআইইউ প্রধান জানান, এই বিশেষ যৌথ তদন্ত প্রতিবেদনের চূড়ান্ত আলোকেই ইতিমধ্যে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি সম্পদ জব্দ করার পাশাপাশি একাধিক ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই সাথে সম্পূর্ণ কর ফাঁকি দিয়ে এবং দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা এই বিশাল অর্থ ও সম্পদ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে ফেরত আনতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনি সহায়তা ও রিকভারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পাদনসহ নানামুখী কার্যকর উদ্যোগ বর্তমানে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এগিয়ে চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *