আর্জেন্টিনার জয়ের পর গ্যালারিতে উত্তেজনা, সমর্থকদের সংঘর্ষে পুলিশি হস্তক্ষেপ

মেসির জাদুকরী প্রত্যাবর্তনে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার ঐতিহাসিক ক্ষণটি কলঙ্কিত হলো মাঠের বাইরের নজিরবিহীন সহিংসতায়। রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর পর আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামের ভেতর ও বাইরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছেন দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সমর্থকেরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মার্কিন পুলিশ ও দাঙ্গা দমন বাহিনীকে ব্যাপক লাঠিচার্জ ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। আটক করা হয়েছে বেশ কয়েকজন উগ্র সমর্থককে। এই ফুটবলের চরম উত্তেজনা শুধু আটলান্টাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; আমেরিকার অন্যান্য শহরসহ খোদ ইংল্যান্ডের বার্মিংহামেও ম্যাচ-পরবর্তী সময়ে দুই দেশের নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।

ম্যাচ জুড়েই ছিল উসকানিমূলক স্লেজিং ও উত্তাপ

প্রত্যক্ষদর্শী ও মার্কিন গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, গতকাল আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ম্যাচ চলাকালীন সময় থেকেই গ্যালারির পরিবেশ ছিল চরম উত্তপ্ত। দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে বারবার তীব্র বাকবিতণ্ডা ও পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক স্লোগান চলছিল। ম্যাচের ৮৪ মিনিট পর্যন্ত ইংল্যান্ড এগিয়ে থাকায় ইংলিশ সমর্থকরা আর্জেন্টাইনদের লক্ষ্য করে ব্যঙ্গাত্মক গান গাইছিলেন। তবে ৮৫ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ ও যোগ করা সময়ে লাউতারো মার্টিনেজের অনবদ্য গোলে নাটকীয়ভাবে আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত হতেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। আলবিসেলেস্তে সমর্থকদের বাঁধভাঙা ও আক্রমণাত্মক উল্লাস সহ্য করতে না পেরে ইংলিশ সমর্থকরা শারীরিক সংঘর্ষের উসকানি দেয়। কটূক্তি ও বর্ণবাদী মন্তব্য বিনিময়ের একপর্যায়ে পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

স্টেডিয়ামের বাইরে দাঙ্গা, হাসপাতালে ভর্তি অনেকে

খেলা শেষে স্টেডিয়ামের মূল গ্যালারি এবং বাইরের বিশাল চত্বরে দুই পক্ষের সমর্থকেরা একে অপরের ওপর লাঠি, বোতল ও চেয়ার নিয়ে চড়াও হন। স্টেডিয়ামের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীরা প্রথমে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলেও উগ্র সমর্থকদের মারমুখী আচরণের সামনে তারা ব্যর্থ হন। পরে আটলান্টা পুলিশ ও বিশেষ বাহিনী এসে অ্যাকশনে যায় এবং কাঁদানে গ্যাস ও বল প্রয়োগ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এই সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ডজনখানেক সমর্থক গুরুতর আহত হয়েছেন। স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করেছে, রক্তাক্ত ও আহত সমর্থকদের উদ্ধার করে আটলান্টার নিকটবর্তী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহর ও ইংল্যান্ডেও ছড়াল সহিংসতা

এই ম্যাচ ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও ক্রীড়া বৈরিতা শুধু আটলান্টার মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সির মতো লাতিন আমেরিকান ও ব্রিটিশ অভিবাসী অধ্যুষিত শহরগুলোতেও খেলা শেষে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে একাধিক হাতাহাতি ও দাঙ্গার খবর পাওয়া গেছে।

একইভাবে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে খোদ ইংল্যান্ডের বার্মিংহামের কয়েকটি স্থানীয় পাব ও জনাকীর্ণ সড়কেও ম্যাচ-পরবর্তী সময়ে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ওপর ক্ষুব্ধ ইংলিশ ফুটবলপ্রেমীদের চড়াও হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বার্মিংহাম পুলিশ শান্তি বজায় রাখতে বেশ কয়েকটি সড়ক অবরুদ্ধ করে তল্লাশি চালিয়েছে।

জাতীয় সংগীতে দুয়ো ও বেকহ্যামকে বিদ্রুপ

অনুসন্ধানে জানা যায়, ম্যাচ শুরুর আগে মাঠের আনুষ্ঠানিকতা চলাকালেই চরম উত্তেজনার ইঙ্গিত মিলেছিল। ইংল্যান্ডের জাতীয় সংগীত ‘গড সেভ দ্য কিং’ বাজানোর সময় স্টেডিয়ামে উপস্থিত আর্জেন্টিনার বিশাল সমর্থকগোষ্ঠী সমস্বরে বিকট দুয়ো (Booing) ধ্বনি দেন, যা ব্রিটিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে ক্ষুব্ধ করেছে।

শুধু তাই নয়, মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামের ভিআইপি (VIP) বক্সে উপস্থিত ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ও ফুটবল কিংবদন্তি ডেভিড বেকহ্যামকে লক্ষ্য করেও গ্যালারি থেকে অনবরত কুরুচিপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি করা হয়। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ডিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মেরে বেকহ্যামের লাল কার্ড পাওয়ার ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির প্রসঙ্গ টেনে আর্জেন্টাইনরা তাঁকে কড়া বিদ্রুপ করতে থাকে। মাঠের ভেতরে লিয়েন্দ্রো পারেদেস ও হ্যারি কেইনের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাব সরাসরি গ্যালারির সাধারণ দর্শকদের ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ে।

ফুটবল ইতিহাসে গত কয়েক দশক ধরে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড লড়াই বরাবরই বিশেষ রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈরিতার প্রতীক হয়ে আছে। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ডস যুদ্ধের (Malvinas War) পর থেকে এই দুই দলের ফুটবলীয় লড়াই আর স্রেফ খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এবারের সেমিফাইনালে মাঠের তীব্র লড়াই এবং ম্যাচ শেষে মাঠের বাইরের এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ প্রমাণ করল, শত বছর পেরোলেও দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক সেই ফকল্যান্ডের ক্ষত ও জাতীয়তাবাদী বৈরিতা ফুটবল মাঠের মোড়কে বারবার ফিরে আসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *