মেসির কোলে থাকা শিশুই আজ প্রতিপক্ষ, বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায় ইয়ামাল

ফুটবল ইতিহাস অনেক রূপকথার জন্ম দিয়েছে, তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের সমাপনী দৃশ্যটি যেন সমস্ত কল্পনাকেও হার মানাতে চলেছে। এবারই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছিল ফিফা (FIFA) র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষ চার দল। আর সব বাধা পেরিয়ে ফাইনালে নিশ্চিত হয়েছে এক অভূতপূর্ব ক্ল্যাসিক লড়াই। এই প্রথম শিরোপার চূড়ান্ত মঞ্চে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বর্তমান ইউরোপসেরা স্পেন ও কোপা আমেরিকা জয়ী আর্জেন্টিনা। আগামী ১৯ জুলাই নিউইর্য়ক নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য এই ব্লকবাস্টার ফাইনালকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে উন্মাদনা এখন তুঙ্গে।

তবে এই ফাইনালের সমস্ত আলো, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর আলোচনা কেড়ে নিচ্ছেন দুই ভিন্ন প্রজন্মের দুই মহাতারকা—ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা কিংবদন্তি লিওনেল মেসি এবং স্পেনের বর্তমান ফুটবল বিস্ময় লামিনে ইয়ামাল। তাদের এই মাঠের মহাযুদ্ধের আগে বিশ্বজুড়ে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া সেই ঐতিহাসিক ছবি। যেখানে ২০০৭ সালে মাত্র ছয় মাস বয়সী শিশু ইয়ামালকে প্লাস্টিকের টবে গোসল করিয়ে কোলে নিয়ে হাসতে দেখা গিয়েছিল ২০ বছর বয়সী তরুণ লিওনেল মেসিকে। সম্প্রতি সেই জাদুকরী ছবির নেপথ্যের গল্প ও স্মৃতি রোমন্থন করেছেন খোদ স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড লামিনে ইয়ামাল।

‘মেসির মুখোমুখি হওয়া আমার জন্য পরম সৌভাগ্য’

স্পেন দলের ফাইনালে ওঠার অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি হয়ে ওঠা লামিনে ইয়ামাল সম্প্রতি ক্রীড়াভিত্তিক জনপ্রিয় ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্ম ‘ডিএজেডএন’ (DAZN)-কে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে লিওনেল মেসির মুখোমুখি হওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। ইয়ামাল বলেন, “আমি এখন কিছুটা বড় হয়েছি, লিও’র বয়সও আগের চেয়ে বেড়েছে। আমি সবসময়ই ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ওর মুখোমুখি হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। অবশেষে ফাইনালে সেই স্বপ্ন সত্যি হচ্ছে। যেহেতু ইউরো ও কোপা চ্যাম্পিয়নদের মধ্যকার ঐতিহ্যবাহী ‘ফিনালিসিমা’ (Finalissima) ম্যাচটি নানা কারণে মাঠে গড়ায়নি, তাই এই বিশ্বকাপের ফাইনালটি আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় এবং বিশেষ সুযোগ।”

নিয়তির অদ্ভুত পরিহাস ও সেই লটারির গল্প

২০০৭ সালের ডিসেম্বরের সেই ঐতিহাসিক ছবিটির পেছনে রয়েছে এক চমৎকার মানবিক ও কাকতালীয় গল্প। বার্সেলোনা ফাউন্ডেশন ও ইউনিসেফের (UNICEF) যৌথ উদ্যোগে একটি দাতব্য ক্যালেন্ডার প্রকাশের প্রচারণা চলছিল। ইউনিসেফের আয়োজিত এক বিশেষ লটারির মাধ্যমে ন্যু ক্যাম্পের আশেপাশের কয়েকটি সাধারণ পরিবারকে এই ফটোশুটে অংশ নেওয়ার জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল। নিয়তির কী অদ্ভুত ও অমোঘ লিখন, লটারিতে বিজয়ী সেই পরিবারগুলোর একটি ছিল লামিনে ইয়ামালের পরিবার!

তখন ন্যু ক্যাম্পের ড্রেসিংরুমে ইউনিসেফের লটারির বাচ্চা হিসেবে যখন ছয় মাসের ইয়ামালকে আনা হয়েছিল, তখন বার্সেলোনার তরুণ ফরোয়ার্ড মেসিও ছিলেন কিছুটা লাজুক। প্লাস্টিকের নীল টবে থাকা সেই ফুটফুটে শিশুটিকে তোয়ালে দিয়ে জড়িয়ে কোলে নিয়েছিলেন মেসি। তখন বিশ্বের কোনো জ্যোতিষী বা ফুটবল বোদ্ধাই ভাবতেও পারেননি যে, ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হওয়া এই লাজুক তরুণটি একদিন ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলার (GOAT) হবেন, আর তাঁর কোলে থাকা ওই অবোধ শিশুটি মাত্র ১৬-১৭ বছর বয়সেই বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় বিস্ময় বালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন।

এবার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন, মঞ্চ মেটলাইফ স্টেডিয়াম

সময় ও নিয়তি আজ ১৯ বছর পর সেই দুই চরিত্রকে আবারও ঠিক এক বিন্দুতে এনে দাঁড় করিয়েছে। তবে এবার প্রেক্ষাপট কোনো দাতব্য অনুষ্ঠান, শান্ত পরিবেশ কিংবা লটারির ফটোশুট নয়; এবার মঞ্চটি হলো কোটি কোটি মানুষের চোখ ধাঁধানো বিশ্বকাপের ফাইনাল। তারা এবার একে অপরের পাশে হাসিমুখে পোজ দেবেন না, বরং মেটলাইফ স্টেডিয়ামের রুদ্ধশ্বাস রণক্ষেত্রে নিজ নিজ দেশকে বিশ্বসেরার মুকুট পরাতে একে অপরের মুখোমুখি হবেন। একপক্ষে থাকবে মেসির শেষ বিশ্বকাপকে রাঙিয়ে রাখার আলবিসেলেস্তেদের আবেগ, অন্যপক্ষে থাকবে ইয়ামালের হাত ধরে স্পেনের ১৬ বছর পর বিশ্বজয়ের স্প্যানিশ গর্জন। ফুটবলবিশ্ব এখন ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই রূপকথার সমাপনী দৃশ্য দেখার প্রহর গুনছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *