গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করা হবে: রংপুরে ডা. শফিকুর রহমান

জাতীয় রাজনীতি ও আঞ্চলিক অধিকার আদায়ের প্রশ্নে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের নীতিগত অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন, “গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করা হবে। আমরা কোনোভাবেই জাতির সাথে বেইমানি করতে পারব না। এই লড়াই থেকে আমরা এক চুল পরিমাণও সরব না।” একই সাথে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও বাজেট বরাদ্দ না থাকা এবং সীমান্ত ইস্যুতে সরকারের নীরব ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেছেন তিনি।

শনিবার (১১ জুলাই ২০২৬) বিকেলে ঐতিহাসিক রংপুর জিলা স্কুল মাঠে চার দফা দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, সীমান্তে ভারতীয় আগ্রাসন ও পুশইন বন্ধ এবং চলমান জনদুর্ভোগ নিরসনের দাবিতে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

গণভোটের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের ডাক

শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতিবিজড়িত রংপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমাদেরকে বিভিন্নভাবে গণভোট বাস্তবায়নের মূল দাবি থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য নানামুখী অপকৌশল চালানো হচ্ছে। তবে আমরা জাতিকে কথা দিয়েছি—লড়াই আমরা করে যাব এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নে এই সরকারকে বাধ্য করব, ইনশাআল্লাহ। যে বৈষম্য দূর করে বাংলাদেশের পচা রাজনীতিকে বিদায় জানিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য আমাদের সন্তানেরা রক্ত দিয়েছিল, সেই সংস্কারের উদ্দেশ্যেই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল।”

বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, “নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেছিলেন, ভোট দেবেন দুটো—একটি আমার দলকে, আরেকটি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বাক্সে। তিনি ক্ষমতায় এসে নিজের দলের প্রথম ভোটটি রক্ষা করেছেন এবং সুফল ভোগ করছেন; কিন্তু জনগণের দেওয়া দ্বিতীয় ভোট তথা গণভোটের রায়কে তিনি রক্ষা করেননি, যা চরম রাজনৈতিক অসততা।”

তিস্তা মহাপরিকল্পনায় বাজেট শূন্য, কঠোর হুঁশিয়ারি

রংপুর তথা উত্তরবঙ্গের জীবনরেখা তিস্তা নদীর প্রসঙ্গ টেনে জামায়াতের আমির বলেন, “বর্তমান সরকারি দল নির্বাচনের আগে ‘জাগো বাহে, তিস্তা বাঁচাও’ স্লোগান দিয়ে মাঠ গরম করেছিল এবং নানা আন্দোলন করেছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, তাদের দেওয়া এই বাজেটে তিস্তা মহাপরিকল্পনার জন্য ১০ টাকারও কোনো অ্যালোকেশন (বরাদ্দ) রাখা হয়নি। আমরা সরকারের ফাঁকা কথার ফুলঝুরি আর শুনতে চাই না, আমরা মাঠে বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চাই।”

তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, “এই সরকার যদি উত্তরবঙ্গের মানুষের ভাগ্য বদলাতে ও তিস্তা প্রজেক্ট বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়, তবে আগামীতে জনগণের সহযোগিতা, দোয়া, ভালোবাসা ও ভোটে নির্বাচিত হয়ে এই ১১ দলীয় ঐক্যই সরকার গঠন করবে এবং তিস্তার দাবি সবার আগে বাস্তবায়ন করবে, ইনশাআল্লাহ। সাফ কথা—তিস্তার ব্যাপারে কোনো ধানাই-পানাই আমরা বুঝি না। তিস্তা প্রজেক্ট অতি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।”

সীমান্ত উত্তেজনা ও সরকারের ‘নীরবতা’ নিয়ে প্রশ্ন

দেশের সীমান্ত সুরক্ষা এবং ভারতের আধিপত্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমাদের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সীমান্তে প্রতিবেশী দেশ ভারত প্রতিনিয়ত সুড়সুড়ি ও উসকানি দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের সরকার মুখে কুলুপ এঁটে সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করছে। দেশের সাধারণ জনগণ এবং আমরা এই অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদ করছি। শুধু প্রতিবাদই নয়, সীমান্ত প্রতিরোধ করার জন্য বিজিবির (BGB) বীর সৈনিকদের সাথে সমানতালে সাধারণ জনগণও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে যাচ্ছে। আমরা এই সংগ্রামী বীর জনতাকে স্যালুট ও অভিনন্দন জানাই।”

সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, “সীমান্তে এত অস্থিরতার পরও সরকারের মুখ থেকে এখন পর্যন্ত একটা শব্দও বের হয়নি। কার ভয়ে, কাকে খুশি করার জন্য আপনারা চুপ করে আছেন? আপনারা কোন দেশের শাসক? মেহেরবানি করে বাংলাদেশের জনগণের নাড়ির পালস এবং তাদের অভিপ্রায় ও আকাঙ্ক্ষাকে বোঝার চেষ্টা করুন। জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে কী ভয়াবহ পরিণতি হয়, তা সাম্প্রতিক ইতিহাস থেকে সবারই সবক (শিক্ষা) গ্রহণ করা উচিত।” সমাবেশে ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন এবং মাঠজুড়ে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *