সুন্দরবনে ‘ছোট জাহাঙ্গীর’ বাহিনীর প্রধানসহ ২৭ বনদস্যুর আত্মসমর্পণ, উদ্ধার বিপুল অস্ত্র-গোলাবারুদ

বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের ধারাবাহিক, দূরদর্শী ও সফল সাঁড়াশি অভিযানের মুখে সুন্দরবনের জলদস্যু ও বনদস্যু সাম্রাজ্যে বড় ধরনের ধস নেমেছে। কোস্টগার্ডের বিশেষ অভিযানের কারণে সুন্দরবনে সক্রিয় অপরাধী চক্রগুলো বর্তমানে ব্যাপকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সুন্দরবনের অন্যতম কুখ্যাত ও দুর্ধর্ষ ‘ছোট জাহাঙ্গীর’ বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শেখসহ সর্বমোট ২৭ জন সক্রিয় ডাকাত সদস্য বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদসহ কোস্টগার্ডের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছে।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই ২০২৬) দুপুরে কোস্টগার্ড সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন স্বাক্ষরিত এক বিশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই ঐতিহাসিক ও বড় ধরনের সাফল্যের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

চরপুটিয়া খালে আত্মসমর্পণ, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের খতিয়ান

কোস্টগার্ড জানায়, সুন্দরবনে কোস্টগার্ডের নানামুখী অভিযানে কোণঠাসা হয়ে জীবন বাঁচাতে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার লক্ষ্যে ‘ছোট জাহাঙ্গীর’ বাহিনীর সদস্যরা আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়। সেই প্রেক্ষিতে, গত ১৩ জুলাই সোমবার বিকেলে বাগেরহাট জেলার মোংলা থানাধীন সুন্দরবনের গভীর অরণ্যের কৌশলগত ‘চরপুটিয়া খাল’ সংলগ্ন এলাকায় ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শেখের নেতৃত্বে ২৭ জন সক্রিয় ডাকাত কোস্টগার্ডের বিশেষ টিমের কাছে আত্মসমর্পণ করে।

আত্মসমর্পণকালে দস্যুরা তাদের ব্যবহৃত ও মজুতকৃত বিপুল পরিমাণ মারণাস্ত্র কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করে। উদ্ধার ও জব্দকৃত অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে:

  • বিদেশি বন্দুক: ৩টি
  • এইট শুটার গান: ১টি
  • ফোর শুটার গান: ১টি
  • দেশীয় একনলা বন্দুক: ৫টি
  • দেশীয় তৈরি পাইপগান: ১৫টি
  • চায়না পাইপগান: ২টি
  • তাজা কার্তুজ (গোলাবারুদ): ৩৪০ রাউন্ড
  • ফাঁকা কার্তুজ: ৫৫ রাউন্ড

আত্মসমর্পণকারী ২৭ দস্যুর পরিচয় ও জেলাভিত্তিক তালিকা

কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, আত্মসমর্পণকারী এই ২৭ জন ডাকাত দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল সাধারণ জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় এবং বন্যপ্রাণী নিধনসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল। তাদের পরিচয় নিচে জেলা ও থানা ভিত্তিক তুলে ধরা হলো:

১. খুলনা জেলা (দাকোপ, কয়রা ও বটিয়াঘাটা থানা):

জাহাঙ্গীর শেখ (৪৫- বাহিনী প্রধান), মুজাহিদ গাজী (২৭), বিল্লাল শেখ (৩৫), জাহিদ হাসান (২৮), সুমোন ঢালী (৩০), এরশাদ শিকারী (৪২), ওয়াহিদুজ্জামান (৩০), আইউব শেখ (৪২), রাফসান ঢালী (৩০), পারভেজ শেখ (২৭), কামরুল শেখ (২৫), জহুরুল গাজী (৩৮), সিরাজুল তরফদার (৩৮), আমিনুল ইসলাম (৪০), আসাদুল ইসলাম (৪২), বাবুল শেখ (৪৫), শাজাহান শেখ (৪২) এবং হেলাল (৩৮)।

২. বাগেরহাট জেলা (রামপাল, ফকিরহাট, কচুয়া, মোড়লগঞ্জ ও শরণখোলা থানা):

আকরাম শেখ (৪৫), নুরুল ইজারদার (৫০), হাসান শেখ (২৭), কামরুল শেখ (২৮), জিয়া শেখ (৩৮), কবির সুলতান (৫৫), কাইয়ুম জমাদ্দার (৪০) ও শরিফুল ইসলাম বয়াতি (২১)।

৩. পিরোজপুর জেলা (মঠবাড়িয়া থানা):

মো. জয়নাল আবেদীন (৩৮)।

পুনর্বাসনের সুযোগ বনাম ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি

কোস্টগার্ডের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর এই আত্মসমর্পণের আগে কোস্টগার্ডের অব্যাহত চাপে সুন্দরবনের আরেক কুখ্যাত ডাকাত ‘ছোট সুমন’ বাহিনীর ৭ জন সদস্য এবং ‘বড় জাহাঙ্গীর’ বাহিনীর ৩ জন সক্রিয় সদস্যও ইতিপূর্বে অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেছিল।

লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন সুন্দরবনের অবশিষ্টাংশে লুকিয়ে থাকা অন্যান্য সক্রিয় বনদস্যুদের অনতিবিলম্বে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ জীবনে ফিরে আসার জোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, আত্মসমর্পণকারীদের সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের (Rehabilitation) সুযোগ দেওয়া হবে। তবে, যারা এই সুযোগ হেলায় হারিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও ডাকাতি অব্যাহত রাখবে, তাদের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ (Zero Tolerance) নীতির আলোকে কঠোরতম সামরিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সুন্দরবন রক্ষায় দুই বিশেষ অপারেশন

কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমান সরকারের বিশেষ দূরদর্শী দিকনির্দেশনায় সুন্দরবনের সক্রিয় সব বনদস্যু বাহিনী চিরতরে নির্মূল এবং উপকূলীয় অঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের নেতৃত্বে “অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন” (Operation Restore Peace in Sundarbans) এবং “অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড” (Operation Mangrove Shield) নামে দুটি বিশেষ ও যুগান্তকারী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

এই সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে এ পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ মোট ৪৫ জন দুধর্ষ বনদস্যুকে আটক করা হয়েছে। একই সাথে দস্যুদের হাতে বিভিন্ন সময়ে জিম্মি হওয়া মোট ৪২ জন সাধারণ জেলে ও বাওয়ালিকে সুন্দরবনের গহীন থেকে জীবিত ও অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান শেষে নিরাপদে তাদের নিজ নিজ পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। সুন্দরবনকে সম্পূর্ণরূপে দস্যুমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে কোস্টগার্ডের নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা তৎপরতা ভবিষ্যতে আরও জোরদার করা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে সংস্থাটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *