দেশে মাধ্যমিক (এসএসসি), উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ের পাবলিক পরীক্ষা চলাকালে দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখার ফলে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার সংকট নিরসনে একটি যুগোপযোগী ও দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালু রাখতে এবং শিক্ষার গুণগত মান ধরে রাখতে এবার সারাদেশে পৃথক ও স্থায়ী পরীক্ষা কেন্দ্র (Permanent Examination Centers) নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই ২০২৬) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে এক সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে এই ঐতিহাসিক ও দূরদর্শী পরিকল্পনার কথা জানান বর্তমান সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এদিন জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রস্তাব অনুমোদন প্রক্রিয়ায়
সংসদে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, পাবলিক পরীক্ষা চলাকালে দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার বিষয়টিকে বর্তমান সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এই সমস্যা সমাধানে এবং সারা বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, মাদ্রাসা, কারিগরি এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার জন্য পৃথক ও স্থায়ী পরীক্ষা কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, “স্থায়ী পরীক্ষা কেন্দ্র নির্মাণের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বর্তমানে একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বা ফিজিবিলিটি স্টাডি (Feasibility Study) প্রস্তাব অনুমোদন প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হলে সমীক্ষার সুপারিশ ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার ভিত্তিতে সারাদেশে পর্যায়ক্রমে স্থায়ী পরীক্ষা কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন প্রকল্প (Development Projects) গ্রহণ করা হবে।”
পাঠদানের ধারাবাহিকতা ও পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় গতি
প্রস্তাবিত এই স্থায়ী পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোর বহুমুখী সুবিধার কথা তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী সংসদকে জানান, এ ধরনের আধুনিক ও স্থায়ী অবকাঠামো স্থাপিত হলে পাবলিক পরীক্ষা চলাকালে সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আর দীর্ঘ মেয়াদে ছুটি ঘোষণা করতে হবে না। এর ফলে স্কুল-কলেজগুলোতে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম ও পাঠদান সারা বছর অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ধারাবাহিকতা বজায় থাকার পাশাপাশি পৃথক কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এটি প্রশ্নফাঁস রোধ, নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং সামগ্রিকভাবে দেশের শিক্ষার মানোন্নয়নে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও বৈপ্লবিক প্রভাব ফেলবে।”
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষায় সরকারের নীতিগত অবস্থান
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের আওতাধীন শিক্ষার্থীদের জন্য এই মুহূর্তে পৃথক ও স্বতন্ত্র স্থায়ী পরীক্ষা কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে আলাদা কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে মূল সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের আওতা এবং ভবিষ্যতে দেশের প্রয়োজনীয়তা, বাস্তবতা ও সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের আলোকে এই বিষয়টিকেও সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হবে।
বক্তব্যের শেষে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জোর দিয়ে বলেন, “বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো—পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় ও আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তুলে পাবলিক পরীক্ষা পরিচালনার জন্য সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিদ্যমান নির্ভরতা কমিয়ে আনা। আমাদের শিক্ষার্থীরা যাতে কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই নির্বিঘ্নে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে, সে লক্ষ্যে সরকার একটি কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণে বদ্ধপরিকর।” সরকারের এই সময়োপযোগী পরিকল্পনাকে দেশের শিক্ষাবিদ ও অভিভাবক মহল ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন।
