রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক লিমিটেডে প্রায় এক দশক আগে সংঘটিত হওয়া ৮০১ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম, জালিয়াতি ও আর্থিক দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগের অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দুর্নীতির অভিযোগের সূত্র ধরে ব্যাংকটির শীর্ষস্থানীয় পাঁচ কর্মকর্তাকে দিনভর ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদকের একটি বিশেষ অনুসন্ধান দল। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তৎকালীন নিয়োগ প্রক্রিয়ার পর্দার আড়ালের নানামুখী অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই ২০২৬) দুর্নীতি দমন কমিশনের সেগুনবাগিচাস্থিত প্রধান কার্যালয়ে এই জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। কমিশনের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আজগর হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত একটি চৌকস ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অনুসন্ধান টিম এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগটি খতিয়ে দেখার দায়িত্ব পালন করছে।
জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি রূপালী ব্যাংকের ৫ কর্মকর্তা
দুদক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, আজকের জিজ্ঞাসাবাদে রূপালী ব্যাংকের যে পাঁচজন কর্মকর্তাকে তলব করা হয়েছিল, তারা প্রত্যেকেই বর্তমানে ব্যাংকটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখায় প্রিন্সিপাল অফিসার (Principal Officer) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়া এই কর্মকর্তারা হলেন—
- তাপসী রায়
- তানভীর আহম্মেদ চৌধুরী
- মনির হোসেন
- অমৃত কুমার বারুরী
- মো. আখেরুল ওয়ালি
তদন্তকারী দলের সদস্যরা এই কর্মকর্তাদের তৎকালীন নিয়োগ পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর জালিয়াতি, মেধা তালিকা ওলটপালট এবং নিয়োগের বিপরীতে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন সংক্রান্ত বিভিন্ন নথিপত্র সামনে রেখে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করেন। অভিযোগ রয়েছে, এই কর্মকর্তারা উক্ত বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সুবিধাভোগী অথবা তৎকালীন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিলেন।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার বক্তব্য ও অনুসন্ধানের পরিধি
রূপালী ব্যাংকের এই বহুল আলোচিত নিয়োগ দুর্নীতি অনুসন্ধানের অগ্রগতি ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা (Public Relations Officer) মো. আকতারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বিস্তারিত তথ্য জানান। তিনি বলেন, “রূপালী ব্যাংকে প্রায় ১০ বছর আগে একসাথে ৮০১ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ, পরবর্তীতে তাদের অনেকের বিতর্কিত পদোন্নতি এবং সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের যে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কমিশনে জমা পড়েছিল, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধান করা হচ্ছে।”
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, আজকের জিজ্ঞাসাবাদটি ছিল চলমান অনুসন্ধান প্রক্রিয়ারই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অভিযুক্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবানবন্দি ও ব্যাংকের সরবরাহকৃত নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেলানো হচ্ছে। অনুসন্ধান শেষ করে খুব দ্রুতই এই বিশেষ টিম কমিশনের নিকট তাদের চূড়ান্ত ও বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন (Inquiry Report) জমা দেবে। প্রতিবেদনের সুপারিশের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়েরসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কমিশন।
প্রায় এক দশকের পুরনো অনিয়ম ও আইনি প্রক্রিয়া
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং ও আইনি সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, প্রায় এক দশক আগে রূপালী ব্যাংকে বড় ধরনের এই জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। সে সময় পরীক্ষা পদ্ধতি, ফলাফল প্রকাশ এবং চূড়ান্ত মেধা তালিকা প্রণয়নে ব্যাপক অস্বচ্ছতার অভিযোগ তুলেছিলেন সাধারণ চাকরিপ্রার্থীরা। অভিযোগ উঠেছিল, যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীদের বঞ্চিত করে তৎকালীন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সিবিএ (CBA) নেতাদের যোগসাজশে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে অনুত্তীর্ণ ও অযোগ্য প্রার্থীদের চাকরি দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় পার হলেও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন এই বৃহৎ জালিয়াতির ফাইলটি পুনরায় সচল করে। দুদকের অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক রিপোর্টার বিডি-কে জানান, “১০ বছর আগের ঘটনা হলেও ব্যাংকের সংরক্ষণাগারে থাকা মূল নথিপত্র এবং কম্পিউটার ডেটাবেজ পরীক্ষা করে জালিয়াতির অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। আজকের জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যগুলো এই মামলার অভিযোগপত্র গঠনে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এই অনিয়মের সঙ্গে ব্যাংকের তৎকালীন উচ্চপর্যায়ের আর কারা কারা জড়িত ছিলেন, তাদেরও একে একে আইনের আওতায় আনা হবে।” এই বড় নিয়োগ কেলেঙ্কারির তদন্তের অগ্রগতি এখন দেশের ব্যাংকিং খাতে এক বড় আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
