আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে সিঙ্গাপুর থেকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো দুই বাংলাদেশিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিন করে পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—সাহেদুল ইসলাম (৩৭) ও রিশাদ তায়ানী (২৫)। দেশের অভ্যন্তরে কোনো বড় ধরনের নাশকতা বা আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে তাদের গভীর যোগাযোগ রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে এই রিমান্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই ২০২৬) আসামিদের ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করা হলে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা শুনানির পর প্রত্যেকের এই ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে, গত বুধবার (৮ জুলাই) দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাদের বিশেষ নজরদারিতে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার ও সিটিটিসির তৎপরতা
তদন্তকারী পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার সিঙ্গাপুর থেকে একটি বিশেষ ফ্লাইটে এই দুই নাগরিককে কড়া পাহারায় বাংলাদেশে ফেরত পাঠায় সিঙ্গাপুর পুলিশ। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনের কর্তব্যরত কর্মকর্তার কাছে তাদের সোপর্দ করা হলে বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটকে জানানো হয়।
সিটিটিসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বার্তা পেয়ে বিমানবন্দর থানা পুলিশের একটি চৌকস দল দ্রুত বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন ডিউটি অফিসারের কক্ষে উপস্থিত হয় এবং আসামিদের নিজেদের হেফাজতে নেয়। এ সময় ধৃত আসামিদের তল্লাশি করে তাদের কাছ থেকে ৩টি আধুনিক মোবাইল ফোন এবং ৩টি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়, যা পরবর্তীতে মামলার আলামত হিসেবে জব্দ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তীতে বিমানবন্দর থানার সাধারণ ডায়েরি (জিডি) মূলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
রিমান্ড আবেদনের মূল ভিত্তি ও পুলিশের দাবি
বৃহস্পতিবার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, বিমানবন্দর থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) আশরাফুল আলম আসামিদের আদালতে হাজির করে সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ৫ দিনের পুলিশ রিমান্ডের আবেদন জানান। রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়, আসামিরা জীবিকার তাগিদে বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুর গমন করলেও সেখানে অবস্থানকালে বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ও ধর্তব্য অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। তারা মূলত সিঙ্গাপুরে অবস্থানরত বিভিন্ন নিষিদ্ধঘোষিত চরমপন্থী ও জঙ্গি সংগঠনের সক্রিয় সদস্য হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন।
সিঙ্গাপুর পুলিশের বিশেষ গোয়েন্দা শাখা তাদের এই সন্দেহজনক ও ক্ষতিকর কার্যক্রমের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার পরই তাদের আটক করে এবং বাংলাদেশে ডিপোর্ট বা ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা সিঙ্গাপুরে বসে উগ্রবাদী ও নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন বলে রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাশকতার আশঙ্কা ও আন্তর্জাতিক মহলের যোগসূত্র অনুসন্ধানের তাগিদ
পুলিশের রিমান্ড আবেদনে আরও গভীর উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতকে বলেন, আসামিরা উগ্র ভাবাদর্শে চরমভাবে দীক্ষিত এবং তারা যেকোনো সময় বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় ধরনের জঙ্গি বা আত্মঘাতী হামলা চালানোর সক্ষমতা ও পরিকল্পনা রাখছিল।
এই আসামিরা বাংলাদেশের স্থানীয় কোনো নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন, যেমন—আনসার আল ইসলাম বা জেএমবির সঙ্গে গোপনে যুক্ত রয়েছে কিনা, কোনো গোপন বা এনক্রিপ্টেড ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস বা অ্যাপস ব্যবহার করে তাদের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছিল কিনা, তা জানা জরুরি। একই সঙ্গে বাংলাদেশে তাদের নেটওয়ার্কের মূল হোতা কারা, এই অপতৎপরতার পেছনে আন্তর্জাতিক কোনো নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সরাসরি ইন্ধন রয়েছে কিনা এবং উগ্রবাদী কার্যক্রমের জন্য অর্থের জোগানদাতা (ফাইন্যান্সার) কারা, তা নিখুঁতভাবে উদঘাটনের জন্যই আসামিদের মুখোমুখি নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড অত্যন্ত প্রয়োজন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে এই যুক্তিসমূহ তুলে ধরে রিমান্ডের জোর দাবি জানানো হয়, অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিনের আবেদন করেন। উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে ৩ দিনের রিমান্ডের এই আদেশ দেন। আসামিদের এখন সিটিটিসি ও থানা পুলিশের সমন্বয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
