কোরআনের নির্দেশনা অনুসরণ করে পরিবেশ ও সব সৃষ্টির যত্ন নেওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক রিপোর্টার বিডি
পবিত্র কোরআনের শিক্ষা অনুসরণ করে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং পৃথিবীর সব সৃষ্টির যথাযথ যত্ন ও পরিচর্যা করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, প্রকৃতি ও পরিবেশ শুধু মানুষের ভোগের জন্য নয়; বরং এগুলোর সংরক্ষণ, পরিচর্যা এবং ভারসাম্য রক্ষা করা মানবসমাজের নৈতিক দায়িত্ব।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাজধানীর চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রে আয়োজিত ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে তিনি পরিবেশ সংরক্ষণে ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিক দায়িত্ব এবং বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষায় ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে আহ্বান
বক্তব্যের একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী পবিত্র কোরআনের সুরা আল-বাকারার ২৯ নম্বর আয়াত উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন—
“তিনি সেই সত্তা, যিনি পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সব তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।”
এই আয়াতের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টি মানুষের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তার ভাষায়, “নদী-নালা, গাছপালা, কীট-পতঙ্গ, বন্য ও গৃহপালিত প্রাণী—আমাদের চারপাশের পরিবেশ ও প্রতিবেশের প্রতিটি উপাদানই মহান আল্লাহর সৃষ্টি এবং মানুষের উপকারের জন্য নির্ধারিত।”
তিনি বলেন, ইসলাম মানুষকে প্রকৃতির সম্পদ দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করার পাশাপাশি সেগুলো সংরক্ষণ ও পরিচর্যারও নির্দেশনা দিয়েছে।
শুধু ভোগ নয়, সংরক্ষণও দায়িত্ব
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রকৃতি থেকে শুধু সুবিধা গ্রহণ করাই মানুষের একমাত্র দায়িত্ব নয়। বরং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়াও মানবজাতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তিনি বলেন, “আল্লাহর সব সৃষ্টি থেকে যদি আমরা উপকার ভোগ করতে চাই, তাহলে মানুষ হিসেবে অবশ্যই আমাদের কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। যথাযথ নিয়মে প্রকৃতির সব সৃষ্টির যত্ন ও পরিচর্যা করা মানবসমাজের নৈতিক দায়িত্ব।”
তিনি আরও বলেন, পরিবেশের ক্ষতি হলে শেষ পর্যন্ত তার নেতিবাচক প্রভাব মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরই পড়বে।
পরিবেশ ও মানুষের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য বা ইকোসিস্টেমের সঙ্গে মানবসমাজের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও অবিচ্ছেদ্য।
তার মতে, মানুষ প্রকৃতির বাইরে নয়; বরং প্রকৃতিরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই পরিবেশের ক্ষতি মানেই শেষ পর্যন্ত মানুষের নিজের অস্তিত্বকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া।
তিনি বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণকে শুধু সরকারি দায়িত্ব হিসেবে দেখলে হবে না। ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠন—সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
বিজ্ঞানের আলোকে পরিবেশের গুরুত্ব
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী আধুনিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণার কথাও উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বর্তমান যুগে বিজ্ঞান স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে, পরিবেশ ও মানুষের জীবন একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিজ্ঞান আজ প্রমাণ করেছে যে, ইকোসিস্টেমের সঙ্গে মানবসমাজের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও অবিচ্ছেদ্য। এই ইকোসিস্টেমের নিরাপদ লালন ও বিকাশের সঙ্গেই মানবসমাজের নিরাপদে বেড়ে ওঠা জড়িত। তাই পরিবেশ রক্ষা করা আমাদের অস্তিত্বেরই অংশ।”
তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং দূষণ মোকাবিলায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
পরিবেশ সুরক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবেশ রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।
তিনি মনে করেন, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না; পরিবেশ সংরক্ষণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। গাছ লাগানো, নদী-খাল রক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পরিবেশবান্ধব নীতি ও কর্মকৌশল বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের তাৎপর্য
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; বরং পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের একটি বৈশ্বিক আহ্বান।
তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ, বনভূমি রক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মতো উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে।
অনুষ্ঠানে পরিবেশ মেলার বিভিন্ন স্টল পরিদর্শনের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, সবুজ উন্নয়ন এবং টেকসই জীবনধারা নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগও তুলে ধরা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্মীয় মূল্যবোধ, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং পরিবেশবান্ধব নীতির সমন্বয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে পরিবেশ সংরক্ষণে আরও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যেও সেই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটেছে বলে তারা মনে করেন।
