বিনিয়োগ বাড়লেও বিসিক শিল্পনগরীতে রপ্তানি অর্ধেকে, বাড়ছে খালি প্লটের সংখ্যা

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) পরিচালিত শিল্পনগরীগুলোতে গত চার বছরে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। একই সঙ্গে শিল্পনগরীগুলোতে খালি শিল্প প্লটের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় নতুন বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের গতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিসিকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বিসিকের আওতাধীন ৮৮৭টি রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রায় ৪৬ হাজার ২৯৩ কোটি টাকার পণ্য বিদেশে রপ্তানি করেছিল। সে সময় এসব প্রতিষ্ঠানে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৪৩ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ১০ শতাংশ এসেছিল বিসিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে।

তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চিত্রটি উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে। এ সময়ে শিল্পখাতে বিনিয়োগ প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেলেও রপ্তানি আয় কমে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকায়। ফলে জাতীয় রপ্তানিতে বিসিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অবদানও অর্ধেকে নেমে এসেছে। বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের মাত্র ৫ শতাংশ আসছে বিসিকের আওতাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগ বাড়লেও উৎপাদন ও রপ্তানির মধ্যে প্রত্যাশিত সমন্বয় না থাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জটিলতাও রপ্তানি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

বিসিক শিল্পনগরীগুলোতে হালকা প্রকৌশল, খাদ্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, পাট ও পাটজাত পণ্য, কাগজ, কাচ ও সিরামিক, চামড়া, ওষুধসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করা হয়। দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের অবস্থান দুর্বল হয়েছে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি মির্জা নূরুল গণি শোভন বলেন, রপ্তানিমুখী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বর্তমানে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং রপ্তানি-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনেক উদ্যোক্তা বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।

অন্যদিকে শিল্পনগরীগুলোতে খালি প্লটের সংখ্যা বৃদ্ধিও নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিসিকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মোট ১৩ হাজার ৩৬৪টি শিল্প প্লটের মধ্যে ১ হাজার ৬৬৭টি প্লট এখনো খালি রয়েছে।

যদিও এক বছর আগে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে খালি প্লটের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭৭৬টি, তবে ওই সময়ের মধ্যে নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩৭৩টি প্লট। এরও আগে ২০২৪ সালের জুনে খালি প্লট ছিল ১ হাজার ১৩৯টি এবং ২০২৩ সালের এপ্রিলে ছিল ১ হাজার ৩টি। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, নতুন শিল্পনগরী সম্প্রসারণের পাশাপাশি উদ্যোক্তা সংকটের কারণে দীর্ঘমেয়াদে খালি প্লটের সংখ্যা বাড়ছে।

বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ২৩৭টি খালি প্লট রয়েছে সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীতে। এছাড়া রাজশাহী শিল্পনগরী-২-এ রয়েছে ১৯টি, চুয়াডাঙ্গা শিল্পনগরীতে ১৮টি এবং বরগুনা শিল্পনগরীতে ১৫টি খালি প্লট রয়েছে।

বিসিক চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রকৃত শিল্প উদ্যোক্তার সংখ্যা প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়া এবং নতুন শিল্প প্লট যুক্ত হওয়ার কারণেই খালি প্লটের সংখ্যা বেড়েছে। তবে যেসব প্লট এখনো বরাদ্দ হয়নি, সেগুলো দ্রুত উদ্যোক্তাদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়ার লক্ষ্যে শিগগিরই নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।

এদিকে শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সম্প্রতি বিসিক কর্মকর্তাদের এক সপ্তাহের মধ্যে সব খালি প্লটের হালনাগাদ তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি শিল্পনগরীগুলোতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়নেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক সেলিম রায়হানের মতে, দেশের কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তাদের বড় একটি অংশ রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, সনদ ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সময়মতো সম্পন্ন করতে পারেন না। এর ফলে বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা কমে যায়।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ ও জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা রপ্তানির পরিবর্তে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য বিক্রি করাকেই বেশি নিরাপদ মনে করেন। ফলে রপ্তানি সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে রপ্তানিমুখী করতে হলে রপ্তানি প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও ব্যবসাবান্ধব করতে হবে। একই সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, সহজ ঋণ সুবিধা, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো গেলে বিসিক শিল্পনগরীগুলোর রপ্তানি আয় আবারও বৃদ্ধি পেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *