হরমুজে কাতার ও সৌদির জাহাজে নতুন করে হামলা, বিশ্ববাজারে লাফিয়ে বাড়ছে তেলের দাম

হরমুজ প্রণালীর কাছে কাতার ও সৌদি আরবের বাণিজ্যিক জাহাজে নতুন করে হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ঘটনাটির পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে। একদিনেই ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৬ ডলারে পৌঁছেছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

হামলার পর মার্কিন নৌবাহিনীর নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার (জেএমআইসি) হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকির মাত্রা ‘মারাত্মক’ (Critical) পর্যায়ে উন্নীত করেছে। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুটে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী কাতারের পতাকাবাহী ট্যাংকার ‘আল রেকায়াত’-এর বাম পাশে হামলা চালানো হয়। হামলার পর জাহাজটির ইঞ্জিন রুমে আগুন ধরে যায় এবং বিস্ফোরণের আশঙ্কা দেখা দেয়। তবে দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে নাবিকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

একই সময়ে ওমান উপকূলের কাছে সৌদি আরবের পতাকাবাহী সুপারট্যাঙ্কার ‘ওয়েদিয়ান’ হামলার শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া ড্রোন হামলায় আরও একটি বাণিজ্যিক ট্যাংকার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুরু হওয়ার পর এই প্রথম মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত কাতারের কোনো জাহাজ হামলার শিকার হওয়ার দাবি উঠেছে। ঘটনাটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

মার্কিন কর্মকর্তাদের প্রাথমিক মূল্যায়নে এসব হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো আন্তর্জাতিক তদন্তের ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।

অন্যদিকে কাতার ও সৌদি আরব পৃথক বিবৃতিতে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। দুই দেশই হামলার জন্য সরাসরি তেহরানকে দায়ী করেছে।

সাম্প্রতিক এই ঘটনার জেরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান ভঙ্গুর সমঝোতা নতুন করে সংকটে পড়েছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল বিক্রির জন্য দেওয়া বিশেষ লাইসেন্স প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে।

মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে যেকোনো হামলা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে একটি কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়। তবে তা সম্ভব না হলে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।

উল্লেখ্য, গত জুন মাসে হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত রাখার প্রেক্ষাপটে ইরানের ওপর আরোপিত কয়েক দশকের কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে সীমিত আকারে তেল রপ্তানির অনুমতি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলার অভিযোগের পর সেই সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে।

এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক চাপ ও হুমকির নীতি অব্যাহত রাখে, তাহলে কোনো ধরনের চূড়ান্ত কূটনৈতিক সমঝোতার পরিবেশ তৈরি হবে না। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, যেসব বাণিজ্যিক জাহাজ দেশটির সঙ্গে সমন্বয় না করে চলাচল করে অথবা নিজেদের ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ রাখে, তারাই নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

বিশ্ব জ্বালানি বাজারে হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে সেখানে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবারের ঘটনার পর হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ১৬টিতে, যা গত তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২৫টি জাহাজ এই রুট ব্যবহার করলেও বর্তমানে তা কমে দৈনিক ২৫ থেকে ৪০টির মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।

জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলের ট্যাঙ্কার বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একটি ট্যাংকারে পণ্য বোঝাইয়ের দৈনিক গড় খরচ গত সপ্তাহে যেখানে প্রায় ২ লাখ ডলার ছিল, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ডলারে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হবে—এমন যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সর্বশেষ এই ঘটনায় তা বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটলে শুধু জ্বালানি বাজার নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *