বাংলাদেশে চক্ষুস্বাস্থ্য খাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা প্রতিরোধে নতুন উদ্যোগের অংশ হিসেবে আগামী নভেম্বরে একটি আন্তর্জাতিক গ্লোবাল সামিট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্মতি দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত।
সোমবার (৬ জুলাই) সকালে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর প্রিভেনশন অব ব্লাইন্ডনেস (IAPB)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পিটার হলান্ড। সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী।
এম এ মুহিত বলেন, বাংলাদেশে চক্ষুস্বাস্থ্যসেবা আরও উন্নত করতে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে এবং আইএপিবির সঙ্গে সরকারের আলোচনা ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জন করেছে।
তিনি জানান, আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য চক্ষু স্বাস্থ্যবিষয়ক গ্লোবাল সামিটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, নীতিনির্ধারক, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং চক্ষুস্বাস্থ্য খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। বাংলাদেশ এই সম্মেলনের অন্যতম কো-হোস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থিত থাকার সম্মতি দিয়েছেন। তার অংশগ্রহণ বাংলাদেশের চক্ষুস্বাস্থ্য খাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জাতীয় চক্ষু উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের সব মানুষের জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত চক্ষু চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকার একটি জাতীয় চক্ষু উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করছে।
তিনি বলেন, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্ব কমানো, আধুনিক চক্ষু চিকিৎসা সম্প্রসারণ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চক্ষুস্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সরকার এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএপিবির সহযোগিতা কামনা করেছে বলেও জানান তিনি।
১০ লাখ ছানি অপারেশনের পরিকল্পনা
সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, দেশের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বৃহৎ পরিসরে ১০ লাখ ছানি অপারেশন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার।
তিনি বলেন, এসব রোগীর ছানি অপারেশনের পর প্রয়োজনীয় ইন্ট্রা-অকুলার লেন্স (IOL) সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরবরাহ করা হবে।
তার মতে, ছানি বাংলাদেশের প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারণ। সময়মতো অস্ত্রোপচার এবং প্রয়োজনীয় লেন্স প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেতে পারেন।
শিশুদের চক্ষুস্বাস্থ্যে বিশেষ গুরুত্ব
এম এ মুহিত বলেন, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলের অনেক স্কুলশিক্ষার্থী চোখের বিভিন্ন সমস্যায় ভুগলেও সময়মতো চিকিৎসার সুযোগ পান না। ফলে তাদের লেখাপড়া ও স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের চক্ষু পরীক্ষা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার নতুন কর্মসূচি গ্রহণের পরিকল্পনা করছে। এ ক্ষেত্রে আইএপিবির কারিগরি ও নীতিগত সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর মতে, শিশুদের চোখের সমস্যা প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা গেলে ভবিষ্যতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতার ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করবে আইএপিবি
সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে আইএপিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পিটার হলান্ড বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পেরে তারা আনন্দিত এবং বাংলাদেশ গ্লোবাল সামিটের কো-হোস্ট হতে সম্মত হওয়ায় সংস্থাটি সন্তুষ্ট।
পিটার হলান্ড জানান, আইএপিবির সদস্য সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে বাংলাদেশে বিভিন্ন পর্যায়ে চক্ষুস্বাস্থ্য উন্নয়নে কাজ করছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সংস্থা এবং অংশীদার সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে জনগণের কাছে মানসম্মত চক্ষু চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ চক্ষুস্বাস্থ্য উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও কার্যকর কর্মসূচি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলে তারা আশাবাদী।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, দেশে প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্ব কমাতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
আসন্ন গ্লোবাল সামিটে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ চক্ষুস্বাস্থ্য খাতে নিজেদের অগ্রগতি তুলে ধরার পাশাপাশি নতুন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় চক্ষু উন্নয়ন পরিকল্পনা, ব্যাপক ছানি অপারেশন কর্মসূচি এবং শিশুদের চক্ষুস্বাস্থ্যসেবার ওপর জোর দেওয়া হলে দেশে প্রতিরোধযোগ্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা কমাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে বলেও তারা মনে করছেন।
