দেশের চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আমদানিকৃত অতিব্যয়বহুল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি আমদানির বিশাল অর্থনৈতিক চাপ কমাতে চায় বিদ্যুৎ বিভাগ। আজ সোমবার (৬ জুলাই, ২০২৬) রাজধানীর একটি অভিজাত মিলনায়তনে আয়োজিত ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের নাগরিক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
তবে মন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, পরিবেশবান্ধব ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় কোনোভাবেই যেন সাধারণ গ্রাহক ও ভোক্তাদের ওপর বাড়তি খরচের বোঝা চেপে না বসে, সেদিকে কঠোর নজর রাখা হবে।
‘জালানি আমদানির চাপ ও বিগত দিনের দায়দেনা মেটানোর একমাত্র পথ’
নাগরিক সংলাপে অংশ নিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির মূল্য যেভাবে ওঠানামা করছে, তাতে দীর্ঘ মেয়াদে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভর করে থাকা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। তাই সৌরবিদ্যুতের মতো পরিবেশবান্ধব অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোই এখন আমাদের মূল লক্ষ্য। এর মাধ্যমে আমরা একদিকে যেমন ডলারের ওপর চাপ কমাতে পারব, অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতের বিগত দিনের বিশাল ঋণ ও দায়দেনা পরিশোধ করার পথ তৈরি হবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে হাঁটার অর্থ এই নয় যে, আমরা চড়া দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা বেসরকারি খাত থেকে চড়া মূল্যে বিদ্যুৎ কিনে সাধারণ ভোক্তার কাঁধে বিশাল বিলের বোঝা চাপিয়ে দেব। আমাদের লক্ষ্য হলো—প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।”
৮০ শতাংশ বিদ্যুৎ বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে, চড়া দামের ফাঁদ
বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতির একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “বিগত সরকারের আমলে করা ত্রুটিপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি পুরোনো চুক্তিগুলোর কারণে বর্তমানে বেসরকারি উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে আমাদের অত্যন্ত উচ্চ মূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী তাদের এই বিশাল অংকের পাওনা ও ক্যাপাসিটি চার্জ যদি সময়মতো পরিশোধ না করা হয়, তবে তারা উৎপাদন বন্ধ করে দেয়, যার ফলে দেশজুড়ে লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়। এই বাধ্যবাধকতার কারণেই বিগত দিনে সরকারকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও কয়েক দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হয়েছে।” বর্তমান সরকার এই চড়া দামের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে চুক্তিগুলো পুনঃমূল্যায়ন করছে বলেও তিনি আভাস দেন।
ভোক্তার স্বার্থ সুরক্ষার দাবি ক্যাবের
সংলাপে বিশেষ বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সম্মানিত জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তিনি সরকারের এই কৌশলপত্রের প্রশংসা করার পাশাপাশি গ্রাহকদের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, “প্রস্তাবিত ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)’-এ বড় বড় বিনিয়োগ এবং মেগা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাগুলো খুব সুন্দর ও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ায় সাধারণ ভোক্তার স্বার্থ ও সুরক্ষার বিষয়টি এখনও অনেকটাই অনিশ্চিত বা অস্পষ্ট রয়ে গেছে। তাই এই কৌশলপত্রটি চূড়ান্ত করার আগে অবশ্যই কয়েকটি মৌলিক বিষয় নিশ্চিত করতে হবে।” তিনি ক্যাবের পক্ষ থেকে ৪টি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেন: ১. গ্রাহকদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ মূল্য কাঠামো (Affordable Tariff Structure) তৈরি করা। ২. গ্রাহক হয়রানি বন্ধে সুনির্দিষ্ট আইনি প্রতিকারের ব্যবস্থা রাখা। ৩. বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC)-এর পূর্ণ স্বাধীনতা ও স্বশাসন ফিরিয়ে দেওয়া। ৪. বিদ্যুৎ খাতের প্রতিটি স্তরে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
এর পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে সরকারি খাতের ওপর চাপ না বাড়িয়ে শতভাগ বেসরকারি বিনিয়োগ (Private Investment) নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।
জালানি খাতের এমন সব যুগান্তকারী সংস্কার, সৌরবিদ্যুতের নতুন প্রকল্প এবং বিদ্যুৎ বিল সংক্রান্ত সব সর্বশেষ খবরের তাৎক্ষণিক আপডেট পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন ‘দৈনিক রিপোর্টার বিডি’-এর অনলাইন সংস্করণে।
