বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার আর্লিং হলান্ড শুধু গোল করার দক্ষতার জন্যই নন, বরং তার কঠোর ফিটনেস, খাদ্যাভ্যাস ও ঘুমের রুটিনের কারণেও নিয়মিত আলোচনায় থাকেন। নরওয়ের এই তারকা ফুটবলারের দৈনন্দিন জীবনযাপনের এমন কিছু অভ্যাস রয়েছে, যা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ঘুমানোর সময় মুখে বিশেষ ধরনের মেডিকেল টেপ ব্যবহার করা, যা ‘মাউথ টেপিং’ (Mouth Taping) নামে পরিচিত।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আইটিভি নিউজ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হলান্ড ঘুমানোর সময় মুখে বিশেষ টেপ লাগিয়ে মুখ বন্ধ রাখেন, যাতে তিনি ঘুমের পুরো সময় নাক দিয়ে শ্বাস নিতে পারেন। শুনতে অস্বাভাবিক মনে হলেও, এই অভ্যাসের পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যগত ধারণা এবং ঘুমের মান উন্নত করার চেষ্টা।
নিজেই জানিয়েছেন নিজের অভ্যাস
একটি জনপ্রিয় পডকাস্টে অংশ নিয়ে আর্লিং হলান্ড প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে তার এই অভ্যাসের কথা জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভালো পারফরম্যান্সের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো মানসম্মত ও গভীর ঘুম। আর সেই ঘুম নিশ্চিত করতে তিনি মুখের পরিবর্তে নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়াকে বেশি গুরুত্ব দেন।
হলান্ডের বিশ্বাস, নাক দিয়ে শ্বাস নিলে শরীর পর্যাপ্ত অক্সিজেন গ্রহণে আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে এবং ঘুমের মান উন্নত হতে পারে। এ কারণেই তিনি ঘুমানোর সময় মুখ বন্ধ রাখতে বিশেষ মেডিকেল টেপ ব্যবহার করেন।
কী বলে বিজ্ঞান?
চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার কিছু স্বীকৃত শারীরবৃত্তীয় সুবিধা রয়েছে। নাক বাতাসকে ফিল্টার, আর্দ্র এবং কিছুটা উষ্ণ করে ফুসফুসে প্রবেশ করায়। পাশাপাশি নাকের মাধ্যমে শ্বাস নেওয়ার সময় শরীরে নাইট্রিক অক্সাইড উৎপন্ন হয়, যা শ্বাসপ্রশ্বাসের কার্যকারিতায় ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাউথ টেপিংয়ের উপকারিতা নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। সীমিত কিছু গবেষণায় নির্দিষ্ট কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল দেখা গেলেও, এটি সবার জন্য কার্যকর বা নিরাপদ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো শক্তিশালী গবেষণা এখনো হয়নি।
হলান্ডের ঘুমের আরও কিছু নিয়ম
মুখে টেপ ব্যবহার ছাড়াও ঘুমের আগে হলান্ড আরও কিছু কঠোর নিয়ম অনুসরণ করেন।
আইটিভি নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘুমানোর প্রায় তিন ঘণ্টা আগে থেকেই তিনি বিশেষ ধরনের ব্লু-লাইট ব্লকিং চশমা ব্যবহার করেন। এই চশমা মোবাইল ফোন, টেলিভিশন ও কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো (Blue Light) চোখে পৌঁছানো কমাতে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাতে অতিরিক্ত ব্লু-লাইটের সংস্পর্শে থাকলে শরীরের মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ ব্যাহত হতে পারে, যা ঘুমের স্বাভাবিক চক্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া হলান্ডের শোবার ঘরে ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ব্যবহারও অত্যন্ত সীমিত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ঘুমানোর সময় ঘরকে ঠান্ডা, অন্ধকার এবং শান্ত রাখার চেষ্টা করেন, যাতে শরীর স্বাভাবিকভাবে বিশ্রাম নিতে পারে।
মাউথ টেপিংয়ের সম্ভাব্য উপকারিতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে মাউথ টেপিংয়ের সম্ভাব্য কিছু উপকারিতা থাকতে পারে। যেমন—
- নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে, যা বাতাসকে পরিশোধিত ও আর্দ্র অবস্থায় ফুসফুসে পৌঁছাতে সাহায্য করে।
- মুখ ও গলা শুকিয়ে যাওয়ার সমস্যা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কমতে পারে, বিশেষ করে যারা রাতে মুখ খুলে ঘুমান।
- কিছু ক্ষেত্রে নাক ডাকা কমাতে সহায়ক হতে পারে, যদি নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার পথে কোনো বাধা না থাকে।
- ঘুমের মান উন্নত হতে পারে, যদিও এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।
সবার জন্য নিরাপদ নয়
চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেছেন, মাউথ টেপিং কোনো সাধারণ স্বাস্থ্যপরামর্শ নয় এবং এটি সবার জন্য নিরাপদও নয়।
যাদের দীর্ঘদিন ধরে নাক বন্ধ থাকে, সাইনাসের জটিল সমস্যা রয়েছে, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (OSA) অথবা অন্য কোনো শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত রোগ রয়েছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই মুখে টেপ লাগিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করবেন না।
এছাড়া সাধারণ অফিস বা প্যাকেজিং টেপ ব্যবহার করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। প্রয়োজনে কেবল এ উদ্দেশ্যে তৈরি মেডিকেল-গ্রেড টেপ ব্যবহার করা উচিত এবং সেটিও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
ঘুমের মান ভালো রাখতে চিকিৎসকরা কিছু সাধারণ অভ্যাস অনুসরণের পরামর্শ দেন। যেমন—
- প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠা।
- ঘুমানোর আগে মোবাইল বা কম্পিউটারের ব্যবহার কমানো।
- ক্যাফেইন ও ভারী খাবার এড়িয়ে চলা।
- শোবার ঘর ঠান্ডা, নীরব ও অন্ধকার রাখা।
- নিয়মিত শরীরচর্চা করা, তবে ঘুমানোর ঠিক আগে নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্লিং হলান্ডের ব্যক্তিগত রুটিন তার পেশাদার ক্রীড়াজীবনের অংশ। তবে কোনো তারকার অভ্যাস অনুসরণ করার আগে সেটি নিজের শারীরিক অবস্থার সঙ্গে মানানসই কি না, সে বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
