সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে সাধারণ গ্রাহকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দেওয়া ‘অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল’ আদায়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে সরকার। এই সংকটের পেছনে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর গাফিলতি, দুর্নীতি কিংবা গ্রাহক হয়রানির প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আজ সোমবার (৬ জুলাই, ২০২৬) রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনের বিজয় হলে দেশের চলমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ এই কড়া হুঁশিয়ারি দেন।
বিদ্যুৎ সচিব জানান, সাধারণ মানুষের এই ভোগান্তির বিষয়টি খোদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নজরেও রয়েছে এবং তিনি সার্বক্ষণিক এই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। ফলে গ্রাহকদের হয়রানি লাঘবে বিদ্যুৎ বিভাগ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে।
কারণ অনুসন্ধানে বিতরণ সংস্থাগুলোকে কঠোর নির্দেশনা
সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, “দেশজুড়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে গ্রাহকদের পক্ষ থেকে যে সব অভিযোগ আসছে, সেগুলোর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এবং সত্যতা যাচাইয়ের জন্য দেশের সবকটি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাকে ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় ও জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।” তিনি স্পষ্ট করেন যে, বিদ্যুৎ বিভাগ গ্রাহকদের কোনো অভিযোগই হালকাভাবে নিচ্ছে না।
ইতিমধ্যে মাঠ পর্যায়ে যেসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়েছে, সেগুলোর সিংহভাগেরই দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়েছে বলে দাবি করেন সচিব। তিনি বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্ক করে বলেন, “গ্রাহকদের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে অতিরিক্ত বিল আদায় করা, দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা কিংবা বিল সংশোধনের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার সাথে যদি বিদ্যুৎ বিভাগের কেউ জড়িত থাকে, তবে তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম বিভাগীয় ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
বিল বাড়ার আসল কারণ কী? ব্যাখ্যা দিলেন সচিব
গ্রাহকদের মনে তৈরি হওয়া বিভিন্ন বিভ্রান্তি দূর করতে বিদ্যুৎ সচিব সংবাদ সম্মেলনে বিল বৃদ্ধির মূল কারণগুলো ব্যাখ্যা করেন। অনেকেই মনে করছেন প্রি-পেইড বা পোস্ট-পেইড মিটারের কারিগরি ত্রুটির কারণে বিল বেশি আসছে, তবে এই ধারণাটি সঠিক নয় বলে জানান তিনি।
সচিব বলেন, “বিদ্যুৎ বিল হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রধান কারণ কিন্তু মিটারের কোনো ত্রুটি বা সমস্যা নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুতের শুল্ক বা দাম বৃদ্ধি, তীব্র গরমে গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া এবং ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলিংয়ের উচ্চতর স্ল্যাবে (Higher Slab) চলে যাওয়ার কারণেই মূলত অনেকের বিল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি এসেছে।” তবে তিনি এটিও স্বীকার করেন যে, মাঠ পর্যায়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষের তৈরি ‘করণিক ভুল’ বা টাইপিংয়ের ভুল (Clerical Error) পাওয়া গেছে। সেসব ভুল চিহ্নিত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিল পুনঃ যাচাই ও প্রয়োজনীয় প্রতিকার দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কিছু সাময়িক কারিগরি ত্রুটির কারণেও কখনো কখনো এই সেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে তিনি জানান।
গ্রাহকদের প্রতি বিশেষ আহ্বান ও গুজব থেকে দূরে থাকার অনুরোধ
যেসব গ্রাহকের নিজেদের বর্তমান বিদ্যুৎ বিল নিয়ে কোনো ধরনের সন্দেহ, সংশয় বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের কোনো ধরনের দালালের শরণাপন্ন না হয়ে সরাসরি সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার নিকটস্থ ‘গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে’ (Customer Care Center) যোগাযোগ করার জন্য বিনীত আহ্বান জানিয়েছেন বিদ্যুৎ সচিব। গ্রাহকদের সুবিধার্থে প্রতিটি কেন্দ্রে মিটার পরীক্ষা (Meter Testing), বিল পুনঃ যাচাই (Bill Re-checking) এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ বুথ ও সেল গঠন করা হয়েছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
একই সাথে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নাগরিকদের প্রতি একটি বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন মিরানা মাহরুখ। তিনি বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য কোথাও ছড়ানো কোনো ধরনের গুজব এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নেতিবাচক প্রচারণায় কান দিয়ে কেউ যেন রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতিসাধন না করেন।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, আবেগের বশবর্তী হয়ে বা ক্ষুব্ধ হয়ে যদি কেউ কোনো বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, ট্রান্সফরমার বা বিদ্যুৎ স্থাপনার ক্ষতিসাধন করেন, তবে তা দেশের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের এই প্রবণতা প্রকারান্তরে জনদুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলবে। তাই সবাইকে ধৈর্য ধরে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সেবা নেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
বিদ্যুৎ বিল সংক্রান্ত যেকোনো নতুন নির্দেশনা, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উপায় এবং জ্বালানি খাতের সব সর্বশেষ আপডেট জানতে নিয়মিত চোখ রাখুন ‘দৈনিক রিপোর্টার বিডি’-এর অনলাইন পোর্টালে।
