‘ফ্যাসিস্ট সরকার কাজের অর্ধেকই খেয়ে ফেলেছে’, পল্লী উন্নয়নে ঐক্যের আহ্বান এলজিআরডি মন্ত্রীর

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেছেন, বিগত সরকারের আমলে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে। তার ভাষায়, “বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার যত কাজ করেছে, তার অর্ধেকই খেয়ে ফেলেছে।” তিনি বলেন, শুধু উন্নয়ন প্রকল্পেই নয়, গ্রামীণ সমাজব্যবস্থা ও সমবায় সংগঠনগুলোরও ক্ষতি করা হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

সোমবার (৬ জুলাই) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি)। দিবসটি উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সমবায় সংগঠন, উদ্যোক্তা এবং গ্রামীণ উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, একটি শক্তিশালী ও টেকসই গ্রামীণ অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে সমবায়ভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতের সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় করেছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ সংগঠনগুলোকে দুর্বল করে দেওয়ায় পল্লী উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, “গ্রামই বাংলাদেশের প্রাণ। গ্রামের উন্নয়ন ছাড়া দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই গ্রামীণ অর্থনীতি, সমবায় এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।”

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বর্তমানে দেশের প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার সমবায় সংগঠক সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদিত বিভিন্ন কৃষিপণ্য, হস্তশিল্প এবং অন্যান্য গ্রামীণ পণ্য বাজারজাত করছেন। দিবস উপলক্ষে আয়োজিত প্রদর্শনীতে এসব পণ্যের বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী। তারা উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে সরকারের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

অনুষ্ঠানের আলোচনা পর্বে বক্তব্য দেন পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে সরকার ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করছে। পাশাপাশি কৃষকদের উৎপাদন কার্যক্রমে সহায়তা দিতে কৃষক কার্ড প্রদান করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং কৃষি উৎপাদন আরও গতিশীল করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রমে স্থবির হয়ে পড়া বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডকে নতুনভাবে সক্রিয় ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হবে। তিনি বলেন, বিআরডিবিকে আধুনিক ও সময়োপযোগী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগণের কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং আয় বৃদ্ধিতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, উন্নত বাংলাদেশ গঠনের জন্য শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; বরং সরকারি প্রতিষ্ঠান, সমবায় সংগঠন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ জনগণকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে গ্রামীণ উন্নয়ন আরও টেকসই হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এদিকে একই দিনে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত আরেকটি আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেখানে তিনি বলেন, পল্লী উন্নয়ন বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সমবায় কার্যক্রম সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছে।

মন্ত্রী বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। শহর ও গ্রামের উন্নয়নের মধ্যে বৈষম্য কমিয়ে এনে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সমান সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকারের চলমান উদ্যোগগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, সমবায় সংগঠনের প্রতিনিধি, উন্নয়নকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। অনুষ্ঠানে গ্রামীণ উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর কার্যক্রমও তুলে ধরা হয়।

পল্লী উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের মতে, সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে। একই সঙ্গে কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *