টানা প্রায় তিন মাস ধরে ইতিবাচক ধারায় রয়েছে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। এ সময়ে লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা ফিরিয়ে আনলেও কার্যক্রম বন্ধ থাকা কোম্পানির শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি এবং দুর্বল প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে অতিরিক্ত লেনদেন নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের পুঁজিবাজারমুখী নীতিগত উদ্যোগ ও ইতিবাচক বার্তার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। তবে একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ ও কার্যক্রমহীন কোম্পানির শেয়ার লেনদেন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।
টানা ৫৪ কার্যদিবসের মধ্যে ৫৩ দিন ৭০০ কোটির বেশি লেনদেন
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৮ এপ্রিল থেকে বাজারে ইতিবাচক ধারা শুরু হয়। ওই দিন মোট ৯৯১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা মূল্যের শেয়ার লেনদেন হয়, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় প্রায় ৩৯৫ কোটি টাকা বেশি।
এরপর থেকে বাজারে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ লেনদেন বজায় রয়েছে। ১৯ মে একদিন ছাড়া বাকি সব কার্যদিবসেই লেনদেন ৭০০ কোটি টাকার ওপরে ছিল। ওই দিন লেনদেন হয়েছিল ৬৭৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
৩০ জুন পর্যন্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়—
- ৫২ কার্যদিবসের মধ্যে ৭ দিন লেনদেন হয়েছে ৭০০ কোটির বেশি।
- ১৮ দিন লেনদেন ৮০০ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।
- ৭ দিন ৯০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে।
- ১৮ দিন লেনদেন হাজার কোটি টাকার সীমা ছাড়িয়েছে।
- দুই কার্যদিবসে লেনদেন দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২২ সালের পর এই প্রথম এত দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে এমন ধারাবাহিক উচ্চ লেনদেন দেখা যাচ্ছে।
সরকারের ইতিবাচক বার্তার প্রতিফলন
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, সরকার পুঁজিবাজারের উন্নয়ন এবং এটিকে আরও অংশগ্রহণমূলক করার বিষয়ে আন্তরিক। বর্তমানে বাজারে যে লেনদেন হচ্ছে, তা মূলত ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের ইতিবাচক প্রত্যাশার প্রতিফলন।
তবে তিনি মনে করেন, বর্তমান বাজার এখনো কাঙ্ক্ষিত গভীরতা অর্জন করতে পারেনি। বাজারকে আরও শক্তিশালী করতে ভালো মানের নতুন কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার বিকল্প নেই।
বন্ধ কোম্পানির শেয়ারে বাড়ছে লেনদেন
লেনদেন বাড়লেও বাজারের একটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো কার্যক্রম বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বিনিয়োগ।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধ বা প্রায় অকার্যকর ৩৩টি কোম্পানির তালিকা প্রকাশিত রয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারেই অনেক বিনিয়োগকারী লেনদেন অব্যাহত রেখেছেন।
এর মধ্যে ২০টি কোম্পানির শেয়ারের দাম গত এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
- একটি কোম্পানির শেয়ার ২৪ টাকা ৪০ পয়সা থেকে বেড়ে ৮০ টাকা ৬০ পয়সায় পৌঁছেছে।
- আরেকটি কোম্পানির শেয়ার ৭০ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ২০৪ টাকা ৩০ পয়সা।
- আবার একটি শেয়ার মাত্র এক কার্যদিবসের ব্যবধানে ২৩০ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বেড়ে ২৫০ টাকা ৮০ পয়সায় লেনদেন হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার সঙ্গে শেয়ারদরের এমন উল্লম্ফনের বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই।
ঝুঁকি বাড়ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের
অর্থনীতিবিদ মাহফুজ কবির বলেন, লেনদেন বাড়া সব সময় ইতিবাচক নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোন ধরনের কোম্পানির শেয়ারে লেনদেন বাড়ছে।
তার মতে, ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্বল কোম্পানির শেয়ারে অতিরিক্ত বিনিয়োগ পুরো বাজারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। কারণ, এসব শেয়ারের দরপতন শুরু হলে দ্রুত বাজারজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
তিনি খারাপ বা ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির শেয়ার লেনদেনে সীমা নির্ধারণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরও কঠোর নজরদারির আহ্বান জানান।
ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির তাগিদ
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফিরিয়ে আনতে ভালো মানের দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনার উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।
অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, সরকারের মালিকানাধীন অনেক লাভজনক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো সরাসরি তালিকাভুক্তির (ডাইরেক্ট লিস্টিং) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসতে পারে। পাশাপাশি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও এখনো তালিকাভুক্ত হয়নি—এমন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বাজারে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
তার মতে, এতে বাজারের গভীরতা যেমন বাড়বে, তেমনি বিনিয়োগকারীদের জন্যও নিরাপদ ও মানসম্মত বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, শুধু লেনদেন বৃদ্ধি নয়, বাজারের গুণগত মান নিশ্চিত করাই হবে টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে তোলার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
