খামেনির শেষ বিদায়ে তেহরানে জনসমুদ্র, যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী ও প্রতিশোধের স্লোগানে মুখর রাজধানী

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানে রাজধানী তেহরান পরিণত হয়েছে শোক, আবেগ ও রাজনৈতিক বার্তার এক বিশাল সমাবেশে। শনিবার (৪ জুলাই) সকালে রাজধানীর ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্স ও আশপাশের এলাকায় লাখো মানুষের উপস্থিতিতে শুরু হয়েছে সাত দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে শোকাহত মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে ‘আমেরিকার মৃত্যু’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগান।

বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, ভোর থেকেই তেহরানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সে জড়ো হতে শুরু করেন। মেট্রো স্টেশনগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়। মেট্রো চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাজারো মানুষ খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে অনুষ্ঠানস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজধানীজুড়ে নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন ব্যবস্থা।

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অনেকের হাতে ছিল লাল পতাকা, যা ইরানি সংস্কৃতিতে প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। শোকাহত জনতার কণ্ঠে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী নানা স্লোগান এবং প্রতিশোধের আহ্বান বারবার উচ্চারিত হতে দেখা যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই স্লোগানগুলো কেবল শোক প্রকাশের অংশ নয়, বরং সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনা ও ইরানের রাজনৈতিক অবস্থানেরও প্রতিফলন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত দৃশ্যে দেখা যায়, গ্র্যান্ড মোসাল্লার বিশাল প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে খামেনির কফিন প্রদর্শন করা হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় নিহত তার পরিবারের সদস্যদের কফিনও জনসমক্ষে আনা হয়। শোকার্ত মানুষ গভীর আবেগের সঙ্গে তাদের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।

ইরানি কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় নিহত হন। ওই হামলায় তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারান। হামলার সময় তিনি তেহরানে নিজ বাসভবনে অবস্থান করছিলেন।

প্রাথমিকভাবে মার্চ মাসে তার দাফনের পরিকল্পনা থাকলেও নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতি এবং চলমান সামরিক উত্তেজনার কারণে তা স্থগিত করা হয়। পরে পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে এলে চার মাস পর রাষ্ট্রীয়ভাবে তার জানাজা ও দাফনের আয়োজন করা হয়।

খামেনির শেষ বিদায়ের এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল তেহরানে পৌঁছেছে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিবেশী ও মিত্র দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, পার্লামেন্ট স্পিকার এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা এতে অংশ নিচ্ছেন।

উপস্থিত প্রতিনিধিদের মধ্যে রয়েছেন ইরাকের প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট স্পিকার, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, সিনেট চেয়ারম্যান ও সেনাপ্রধান, আফগানিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এবং তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট।

এছাড়া সৌদি আরবের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী, কাতারের শুরা কাউন্সিলের স্পিকার, ওমানের স্টেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, ইয়েমেনের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং মিসরের সিনেট স্পিকারও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের মধ্যে রয়েছেন রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান, চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান, বেলারুশের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার, জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট, সার্বিয়ার তথ্য ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী, কাজাখস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, উজবেকিস্তানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং কিরগিজস্তানের পার্লামেন্ট স্পিকার।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও জাতীয় সংসদের স্পিকার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়ে তেহরানে উপস্থিত রয়েছেন। এছাড়া মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, বুরকিনা ফাসো, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, নামিবিয়া এবং নিকারাগুয়ার প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও), ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) এবং ডেভেলপিং-৮ (ডি-৮)-এর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা গেছে।

এছাড়া ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ, হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের বিভিন্ন গোষ্ঠী, লেবাননের রাজনৈতিক সংগঠন এবং ফিলিস্তিনি ধর্মীয় নেতাদের প্রতিনিধিরাও খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি ইরানের রাজনৈতিক অবস্থান, আঞ্চলিক প্রভাব এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে বিপুল জনসমাগম এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতি ইরানের রাজনৈতিক বার্তাকে আরও শক্তিশালীভাবে তুলে ধরার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সাত দিনব্যাপী এই রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা, রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা নিবেদন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ অব্যাহত থাকবে। অনুষ্ঠানকে ঘিরে তেহরানজুড়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *