দেশে সিগারেটের ওপর ধারাবাহিকভাবে ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও অন্যান্য কর বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈধ বাজারে সিগারেটের দাম বেড়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিদেশি সিগারেটের চোরাচালান উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা যাত্রীদের লাগেজ ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ আমদানি-নিষিদ্ধ সিগারেট দেশে আনার প্রবণতা বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে চোরাকারবারিরা অন্যতম ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে।
কাস্টমস ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অভিযান চালিয়ে ২৪ হাজার ৩৬৪ কার্টন বিদেশি সিগারেট জব্দ করা হয়েছে। একই সময়ে বিপুল পরিমাণ ই-সিগারেট ও ধূমপান-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সামগ্রীও উদ্ধার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা অধিকাংশ আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে যাত্রীদের লাগেজে স্বাভাবিক সীমার অনেক বেশি পরিমাণ সিগারেট বহনের ঘটনা ধরা পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি লাগেজ থেকেই ১০ থেকে ২০ কার্টন, আবার কোনো কোনো যাত্রীর কাছ থেকে এরও বেশি পরিমাণ সিগারেট উদ্ধার করা হচ্ছে।
স্ক্যানিং জোরদার হওয়ায় বাড়ছে জব্দের পরিমাণ
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন শেখ আবদুল্লাহ আলমগীর বলেন, কাস্টমস গোয়েন্দা সংস্থা ও এভিয়েশন সিকিউরিটির সদস্যরা সমন্বিতভাবে তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
তিনি জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নজরদারি বৃদ্ধি এবং আধুনিক স্ক্যানিং ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহারের ফলে বিপুল পরিমাণ চোরাচালানি সিগারেট জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। এতে একদিকে যেমন অবৈধ বাণিজ্য রোধ করা যাচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব সুরক্ষাও নিশ্চিত হচ্ছে।
মাসভিত্তিক জব্দের চিত্র
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে বিভিন্ন সময়ে জব্দ হওয়া সিগারেটের পরিমাণ ছিল উল্লেখযোগ্য।
- গত বছরের ডিসেম্বরে জব্দ হয় ৬ হাজার ৫৪২ কার্টন সিগারেট।
- জানুয়ারিতে উদ্ধার করা হয় ১ হাজার ৯৯৭ কার্টন।
- ফেব্রুয়ারিতে জব্দ হয় ৪ হাজার ৩৩৪ কার্টন।
- মার্চে উদ্ধার হয় ১ হাজার ৪৫৬ কার্টন।
- এপ্রিলে জব্দ করা হয় ৪ হাজার ১৯১ কার্টন।
- আর মে মাসেই উদ্ধার হয় ৫ হাজার ৮৪৪ কার্টন বিদেশি সিগারেট।
কর্তৃপক্ষের মতে, এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, বিদেশি সিগারেটের অবৈধ আমদানি রোধে অভিযান জোরদার হলেও চোরাচালান চক্র এখনো সক্রিয় রয়েছে।
ব্যাগেজ রুলস কী বলছে?
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন জানান, বিদ্যমান ব্যাগেজ রুলস অনুযায়ী বিদেশ থেকে আগত একজন যাত্রী ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ ২০০ শলাকা, অর্থাৎ ১০ প্যাকেট সিগারেট দেশে আনতে পারেন।
তিনি বলেন, “নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত সিগারেট বহন করলে তা আইন অনুযায়ী জব্দ করা হয়।”
কর্তৃপক্ষের মতে, অনেক যাত্রী ব্যক্তিগত ব্যবহারের অজুহাতে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমাণ সিগারেট বহন করছেন, যা সরাসরি আইন লঙ্ঘনের শামিল।
কেন বাড়ছে চোরাচালান?
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ডিউটি-ফ্রি দোকান থেকে তুলনামূলক কম দামে সিগারেট কেনা যায়। পরে সেই সিগারেট বাংলাদেশে শুল্ক পরিশোধ না করেই বাজারজাত করলে কয়েক গুণ বেশি লাভ করা সম্ভব হয়।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মুখপাত্র প্রকৌশলী ইব্রাহীম খলিল বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ডিউটি-ফ্রি বাণিজ্যের অন্যতম বড় কেন্দ্র হওয়ায় সেখানে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সিগারেটের দাম অনেক কম।
তার ভাষায়, “যদি এসব সিগারেট শুল্ক ছাড়াই দেশে প্রবেশ করানো যায়, তাহলে দুই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব। মূলত এই অতিরিক্ত লাভের আশাতেই চোরাকারবারিরা ঝুঁকি নিয়ে অবৈধভাবে সিগারেট আমদানির চেষ্টা করছে।”
দেশে দাম বেশি, বিদেশে অনেক কম
বর্তমানে বাংলাদেশে সরকার নির্ধারিত দামে নিম্ন স্তরের ১০ শলাকা সিগারেটের মূল্য ৬২ টাকা থেকে শুরু হয়ে প্রিমিয়াম শ্রেণির সিগারেটের দাম ২১০ টাকা পর্যন্ত রয়েছে। প্রতিটি স্তরেই সম্পূরক শুল্ক ও অন্যান্য কর কার্যকর রয়েছে।
অন্যদিকে, শুল্ক কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষ করে দুবাইয়ের ডিউটি-ফ্রি মার্কেটে একই ধরনের সিগারেট বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি শলাকা মাত্র ৩ থেকে ৫ টাকা দামে কেনা সম্ভব। পরে সেই সিগারেট দেশের বাজারে ২০ টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি করা হয়।
এই বিশাল মূল্য ব্যবধানই বিদেশি সিগারেটের অবৈধ ব্যবসাকে লাভজনক করে তুলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নজরদারি আরও বাড়ানোর দাবি
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতিদিন অন্তত ১০টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট অবতরণ করে। এসব ফ্লাইটের বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আসে।
কাস্টমস কর্মকর্তাদের মতে, প্রতিটি যাত্রীর লাগেজ আরও কার্যকরভাবে স্ক্যান ও তল্লাশি করা সম্ভব হলে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সিগারেট জব্দ করা যাবে এবং রাজস্ব ফাঁকির বড় একটি উৎস বন্ধ করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বিমানবন্দরে অভিযান চালালেই হবে না; চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত সংগঠিত নেটওয়ার্ক, সরবরাহ চেইন এবং অবৈধ বাজারের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বিত অভিযান আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
