কেউ হারিয়েছেন একমাত্র উপার্জনক্ষম বুকের মানিককে, কেউ হারিয়েছেন আজীবন সুখ-দুঃখে পাশে থাকার জীবনসঙ্গীকে। সন্তান ও স্বজন হারানোর সেই দগদগে ক্ষত নিয়ে আজ শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানীর বুকে জড়ো হয়েছিলেন তারা। একে একে যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বজনরা তাদের সেই রক্তাক্ত দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করছিলেন, তখন মিলনায়তন জুড়ে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। কান্নায় ভেঙে পড়েন শহীদ পরিবারের সদস্যরা, যার রেশ ছুঁয়ে যায় উপস্থিত অন্য অতিথিদেরও। রক্তক্ষয়ী সেই জুলাই-আগস্টের স্মৃতি আর বেদনার চাদরে ঢাকা পড়েছিল পুরো আয়োজন।
আজ শনিবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে (বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র) জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে এবং তাদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে শুরু হয় এই ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন’। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে আয়োজিত এই স্মরণ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, রক্তাক্ত জুলাই বিপ্লবের শহীদদের স্মরণেই এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানের মূল মঞ্চের ব্যানারে লেখা ছিল–‘গর্বিত ইতিহাস, অদম্য চেতনা ৪ জুলাইয়ের এই দিনে হোক সবার অনুপ্রেরণা, যে আত্মত্যাগ ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে।’ জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে এই স্মরণ সভায় জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। স্মৃতিচারণা আর শ্রদ্ধার এই আয়োজনে আরও উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, দেশের শীর্ষস্থানীয় politician, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং পেশাজীবী নেতারা।
স্বজনদের অশ্রুসিক্ত স্মৃতিচারণ ও বিচার দাবির আকুতি
সম্মেলনে অংশ নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত প্রথম শহীদ আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন বলেন, ‘আমার ছোট ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তার আত্মত্যাগ সবাইকে অনুপ্রাণিত করেছিল রাজপথে নামার জন্য। জুলাইয়ে অংশগ্রহণ করা অনেকেই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তাদের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করার আর্জি জানাচ্ছি।’ ভাইয়ের হত্যা মামলার রায় দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই স্মৃতি স্মারক সংরক্ষণ করার আর্জি জানাচ্ছি। এই স্মৃতিগুলোই আমাদের শক্তি।’
নিহত ১৫ বছর বয়সি আলভীর বাবা আবুল হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সন্তানের বিচারের জন্য আমরা আন্দোলন করেছি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিচারের নামে একধরনের প্রতারণা করেছে। এখন আমরা বর্তমান সরকারের কাছে একটি দৃশ্যমান ও সুষ্ঠু বিচারের প্রত্যাষা করছি।’ একইভাবে আক্ষেপ ও বিচারহীনতার শঙ্কা প্রকাশ করেন শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিক আলম। তিনি বলেন, ‘আদৌ আমরা সন্তানের বিচার পাব কি না, তা জানি না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলতে চাই, একজন সন্তান হত্যার বিচার হলেও আমরা শান্তি পাব।’
নিহত শহীদ মিরাজের বাবা আব্দুর রব মিয়া স্মৃতিফলক সুরক্ষার দাবি জানিয়ে বলেন, ‘আমার ছেলে তার মোবাইল দিয়ে ভিডিও করছিল, এটাই তার অপরাধ ছিল। শুধু জুলাই না, শাপলা চত্বর ও পিলখানা হত্যারও বিচার করতে হবে। জুলাই শহীদদের কবরের নামফলক তৈরির জন্য বিভিন্ন ministry ঘুরে আমাদের হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে জুলাই স্মৃতিফলকগুলো অবহেলায় রয়েছে। যাত্রাবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যেখানে জুলাই শহীদদের নাম লেখা থাকে, তার সম্মান যেন বজায় থাকে।’
স্মরণ সভায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে শহীদ আবদুল্লাহ জামিলের মা ফাতেমা তুজ জোহরা বিগত দিনের অবহেলার চিত্র তুলে ধরে বলেন, “আমার বড় ছেলে ৫ আগস্ট শহীদ হয়। এরপর আমার ১৩ বছরের ছোট ছেলের ক্যানসার ধরা পড়ে এবং আমার স্বামীও মারা যান। আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে যথাযথ সাহায্য পাই নাই। যাদের ডাকে আমরা সাড়া দিয়েছিলাম, তারা কেউ আমাদের কাছে আসে নাই। তবে ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ ও তারেক রহমান সবসময় আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।”
আহত যোদ্ধাদের বঞ্চনার ক্ষোভ
অনুষ্ঠানে আহত যোদ্ধারাও নিজেদের বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন। আহত শাহীন মালু বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দুইভাবে আমাদের দেখেছে। তবে দেশ নিরাপদ থাকবে বিএনপির হাতে।’ অন্যদিকে ছাত্রদল কর্মী ও জুলাই যোদ্ধা মিল্লাত হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘৫ আগস্টের আগে পর্যন্ত আমরা বিএনপি কর্মীরা কেউ পরিপূর্ণ চিকিৎসা পাইনি। আমরা ছাত্রদলের কর্মী হওয়ায় ভিন্ন political দলের পরিচয়ের কারণে আমাদের গেজেটে নাম ওঠানো বা মূল্যায়ন করা হয়নি।’
ইতিহাসের সেই ৩৬ দিন
অনুষ্ঠানে ইতিহাসের প্রেক্ষাপট টেনে স্মরণ করা হয়, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্রদের আন্দোলন শেষমেশ সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী সরকার উৎখাতের আন্দোলনে রূপ নেয়। ৩৬ দিনের সেই ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালাতে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে পুরো দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলন দমাতে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে গুলি, টিয়ারশেল ও চরম বলপ্রয়োগ করা হয়। এমনকি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে প্রথমে ফেসবুক এবং পরে ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হলেও তা হিতে বিপরীত হয়। ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর এই আন্দোলন গণবিস্ফোরণে রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত রক্তপাত শুরু হওয়ার ২০ দিনের মাথায় পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের।
উল্লেখ্য, জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের যে তালিকা সরকার গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে, সেখানে শহীদের সংখ্যা ৮৩৪ জন। তবে অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হতে পারে বলে ধারণা দেয়া হয়েছে।
