৪০ অভিযানেও দখলমুক্ত হয়নি গোক্ষুদী চর, ৩৯০ একর খাসজমিতে ৫০টির বেশি ঘের

চাঁদপুরের মেঘনা নদীর বুকে গোক্ষুদী চরের ৩৯০ একর সরকারি জমি দখলমুক্ত করতে দুই বছরে অন্তত ৪০টি অভিযান চালিয়েছে প্রশাসন। এসব অভিযানে ৪৫টি ভেকু মেশিন নষ্ট করা হয়েছে, আদায় করা হয়েছে প্রায় চার লাখ টাকা জরিমানা। সর্বশেষ গত ২২ ও ২৩ অক্টোবর টানা দুই দিনের অভিযানে ৫০টির বেশি মাছের ঘেরের বাঁধ কেটে মাছ নদীতে ছেড়ে দেয়া হয়। এরপরও স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়নি সরকারি জমি দখলের তৎপরতা।

ভূমির নথিপত্র ও মানচিত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চাঁদপুর সদর উপজেলার ইব্রাহিমপুর ইউনিয়নের গোক্ষুদী মৌজার সংশ্লিষ্ট ৩৯০ একর জমি এক নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত। অর্থাৎ, নথি অনুযায়ী জমিগুলোর মালিক বাংলাদেশ সরকার। সরকারি জমিতে মাছের ঘের নির্মাণ, মাটি কাটা ও বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে চাঁদপুর ও শরীয়তপুরের কয়েকজন জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রশাসন মামলা করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তবে উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষতির অভিযোগ তুলে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঘেরমালিক মমিন দিদার। তার দাবি, নিজেদের ও পারিবারিক সম্পত্তিতে ঘের তৈরি করা হয়েছিল। এমনকি শরীয়তপুরের সীমানার ভেতরেও চাঁদপুর সদর উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন মমিন।

অন্যদিকে, সরকারি নথিতে জমিগুলো খাস হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় ঘের নির্মাণ ও দখলের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এতগুলো অভিযান, মামলা ও জরিমানার পরও কেন সরকারি জমি স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত করা যাচ্ছে না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

চাঁদপুর সদর উপজেলার ইব্রাহিমপুর ইউনিয়নের গোক্ষুদী মৌজায় মেঘনা নদীর বুকে বিস্তীর্ণ চরজুড়ে একসময় ছিল ফসলি জমি। চলতি বছরের শুরুর দিকে এসব জমির বড় অংশে মাটি কেটে মাছের ঘের তৈরি করা হয়। ঘের নির্মাণে মাটি কেটে উঁচু বাঁধ দেয়া হয়। সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল করে মাটি কাটা ও বিক্রির অভিযোগ রয়েছে মমিন দিদারসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে।

ভূমির নথিপত্র ও মানচিত্র পর্যালোচনায় গোক্ষুদী মৌজার সংশ্লিষ্ট ৩৯০ একর জমি এক নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত বলে দেখা গেছে। ইব্রাহিমপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার মো. মহিউদ্দিনও জমিগুলো সরকারি বলে জানিয়েছেন।

পাশের চালিতাতলী মৌজাতেও ভূমি উন্নয়ন কর আদায় বন্ধ রেখেছে ভূমি অফিস। তবে সরকারি জমিতে মাছের ঘের নির্মাণ ও মাটি কাটার সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো, দীর্ঘদিন ধরে এসব কর্মকাণ্ড চলার পরও কেন স্থায়ীভাবে দখল বন্ধ করা গেল না, এসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।

প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এসব অবৈধ ঘের উচ্ছেদে গত দুই বছরে অন্তত ৪০টি অভিযান চালানো হয়েছে। নষ্ট করা হয়েছে ৪৫টি ভেকু মেশিন এবং জরিমানা আদায় করা হয়েছে প্রায় চার লাখ টাকা। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করা হলেও দখল পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।

গত ২২ ও ২৩ অক্টোবর ইব্রাহিমপুর চরে সর্বশেষ উচ্ছেদ অভিযান চালায় প্রশাসন। এ সময় মাছের ঘেরের বাঁধ কেটে মাছ নদীতে ছেড়ে দেয়া হয়।

অভিযানের পর আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ তুলে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ঘেরমালিক মমিন দিদার। তার দাবি, নিজেদের ও পারিবারিক জমিতে ঘের নির্মাণ করা হয়েছিল। চাঁদপুরের প্রশাসন শরীয়তপুরের সীমানায় গিয়েও নোটিশ ছাড়া অভিযান চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তবে সরকারি ভূমির নথিপত্রে গোক্ষুদী মৌজার সংশ্লিষ্ট ৩৯০ একর জমি খাস হিসেবে চিহ্নিত। ফলে ঘেরমালিকের দাবির সঙ্গে সরকারি নথির অবস্থান নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে।

চাঁদপুর সদর উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রত্যয় হাশেম বলেন, সরকারি সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করা বা সেখানে প্রবেশ করে স্থাপনা নির্মাণ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এম এন এম জামিউল হিকমা বলেন, চর দখলমুক্ত করতে এর আগেও একাধিকবার অভিযান চালানো হয়েছে। এবার প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। যে কোনো মূল্যে সরকারি সম্পত্তি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রশাসন সেই চেষ্টা চালিয়ে যাবে।

উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে ৭১টি ছাগল, ২৭টি গরু ও ৩০০টি মুরগি লুটের অভিযোগ তুলেছেন ইকবাল মিয়া। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য সরাসরি নেয়া সম্ভব হয়নি।

প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে তার বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সরাসরি কথা বলতে রাজি হননি। তার স্ত্রীর কাছ থেকেও অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

বুধবার সকালে সরেজমিনে ঘেরের পাড়ে নতুন করে নির্মিত কিছু স্থাপনা দেখা গেছে। স্থানীয় জাহাঙ্গীর হোসেন, শাহাদাত ও হনুফা বেগমসহ কয়েকজন দাবি করেন, এসব স্থাপনায় গরু-ছাগল পালনের কার্যক্রম তারা দেখেননি। তারা ইকবাল মিয়ার অভিযোগকে মিথ্যা বলে দাবি করেন এবং তার বিরুদ্ধে গরু চুরিসহ বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন।

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, ইকবাল মিয়ার সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত বিরোধ রয়েছে এবং তারা তার কাছে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে উচ্ছেদ অভিযানে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি লুটের অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল এবং মাটি বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন চাঁদপুর জেলা বিএনপির নেতারা। তাদের বক্তব্য, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

চাঁদপুর জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক হযরত আলী বলেন, এ ধরনের দখলের সঙ্গে চাঁদপুরের কয়েকজন জড়িত রয়েছেন। তাদের মধ্যে একজনকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। বাকিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

এদিকে, মঙ্গলবার সকালে চাঁদপুর সদর উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সরকারি জমি অবৈধভাবে দখলে রাখলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক।

তিনি বলেন, দখলদার যত প্রভাবশালীই হোক, সরকারি জায়গা দখলে রাখতে পারবে না। সদর উপজেলার সব সরকারি জমি চিহ্নিত করে অবৈধ দখলমুক্ত করতে প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

সরকারি সম্পত্তি রক্ষা ও অবৈধ দখল উচ্ছেদে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

গোক্ষুদী চরে বারবার অভিযান, ভেকু মেশিন নষ্ট, জরিমানা ও মামলা; কোনোটিই এখন পর্যন্ত স্থায়ীভাবে দখল বন্ধ করতে পারেনি। সরকারি নথিতে খাসজমি হিসেবে চিহ্নিত বিস্তীর্ণ এলাকায় কীভাবে মাছের ঘের গড়ে উঠল, কারা এর পেছনে রয়েছে এবং অভিযানের পরও কেন দখল ঠেকানো যাচ্ছে না; এসব প্রশ্নের কার্যকর নিষ্পত্তি জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *