ভারতে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মসূচির সুযোগ দেওয়া হয়নি

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের ভূখণ্ডে অবস্থানকালে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি বা কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি বা সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে লোকসভাকে জানিয়েছে দেশটির কেন্দ্র সরকার। একই সাথে তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে ঢাকা থেকে দেওয়া প্রত্যর্পণের অনুরোধটি প্রচলিত আইন ও আইনি পদ্ধতি অনুসরণ করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় উপস্থাপিত পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই ২০২৬) ভারতের জনপ্রিয় দৈনিক ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র এক বিশেষ প্রতিবেদনে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

লোকসভায় প্রতিবেদন পেশ ও কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের ভূমিকা

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর (প্রত্যর্পণ) বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে যে আবেদন জানানো হয়েছে, তা বর্তমানে বিদ্যমান আইন ও প্রতিষ্ঠিত আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কর্তৃপক্ষ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করছে।

ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা শশী থারুরের সভাপতিত্বে পরিচালিত পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশের ওপর কেন্দ্র সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি বৃহস্পতিবার লোকসভায় পেশ করা হয়। ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক কমিটির নবম মূল প্রতিবেদনে থাকা বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা সেখানে তুলে ধরা হয়।

সংসদীয় কমিটি জানিয়েছে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা বিচারিক আদালতে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে প্রাণদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো প্রত্যর্পণের অনুরোধটি তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আমলে নিয়েছে। এই পর্যালোচনার সার্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে কেন্দ্র সরকারকে নিয়মিত তথ্য জানিয়ে আপডেট রাখতেও বিশেষ অনুরোধ করেছে কমিটি।

‘মানবিক কারণে আশ্রয়, কিন্তু রাজনৈতিক সুযোগ নেই’

ভারতে শেখ হাসিনার দীর্ঘ অবস্থানের ব্যাখ্যা দিয়ে সংসদীয় কমিটি উল্লেখ করেছে, শেখ হাসিনাকে ভারতে থাকতে দেওয়া দেশটির হাজার বছরের ‘সভ্যতার চিরন্তন আদর্শ এবং চরম দুর্দশা বা অস্তিত্বের সংকটে পড়া ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়ার বৈশ্বিক মানবিক ঐতিহ্যের’ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

তবে কমিটি সুনির্দিষ্টভাবে স্পষ্ট করেছে যে, ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে তাদের মাটিতে বসে কোনো প্রকার রাজনৈতিক প্রচার-প্রচারণা বা সভা-সমাবেশ করার কোনো অবকাশ দেয়নি। ভারতের সুস্পষ্ট নীতি হলো—নিজেদের ভূখণ্ডকে ব্যবহার করে অন্য কোনো বন্ধুপ্রতীম দেশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ কাউকে কখনো দেওয়া হবে না এবং শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও সেই নীতি কঠোরভাবে প্রযোজ্য রাখা হয়েছে।

কমিটি কেন্দ্র সরকারকে সুপারিশ করেছে যে, সরকার যেন বন্ধু রাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতি তার এই ‘নীতিগত ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি’ অক্ষুণ্ন রাখে এবং একই সাথে আন্তর্জাতিক আইনি দায়বদ্ধতার কথা মাথায় রেখে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে পুরো ইস্যুটি মোকাবিলা করে।

প্রেক্ষাপট ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান সমীকরণ

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে বিভিন্ন টানাপোড়েন দেখা যায়। পরবর্তীতে দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করে এবং তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকেই মূলত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে সাজা পরোয়ানার আওতায় আনার প্রক্রিয়া জোরদার হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *